টিম কুক: সাধারন এক্সিকিউটিভ থেকে এ্যাপল সিইও


  • By
  • May 3rd, 2018
  •    
  • পড়তে সময় লাগবে: 5 minutes
  • 1,496 views
5 mins read

একনজরে লেখাটির বিষয়ে:

একজন উদ্যোক্তা না হয়েও টিম কুক প্রযুক্তি এবং ব্যবসার জগতে নিজেকে একজন আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কতটা যোগ্যতা থাকলে স্টিভ জবস নিজে একজন মানুষকে তাঁর নিজের স্থানে মনোনীত করে যান তা বুঝতে জিনিয়াস হওয়ার প্রয়োজন হয় না। আজকে আপনি জানবেন অসাধারন প্রতিভাধর এই মানুষটির সাফল্যযাত্রার কথা।


টিম কুক টেক জায়ান্ট এ্যাপল এর বর্তমান সিইও অর্থা‌ৎ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা । এ্যাপলের নাম মনে এলে প্রথম যে মানুষটির কথা মাথায় আসে তিনি অবধারিত ভাবেই স্টিভ জবস। এ্যাপলকে আজকের পৃথিবীর সেরা একটি ব্র্যান্ড বানানোর পেছনে স্টিভ জবসের অবদান অনস্বীকার্য। আধুনিক প্রযুক্তি জগতের অন্যতম একজন পথিকৃৎ ধরা হয় তাঁকে। কিন্তু স্টিভ জবসের মত একজন মানুষের উত্তরসূরী হয়ে সফল ভাবে কোম্পানীটিকে আগের স্থানে ধরে রাখার জন্য স্টিভ জবসের যোগ্যতাগুলো তাঁর অবশ্যই থাকতে হবে। এবং কুক ইতোমধ্যেই প্রমান করেছেন, তিনি সবদিক দিয়েই জবসের যোগ্য উত্তরসূরী।

এ্যাপলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুঃসময়ে কমপ্যাকের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে এসে তিনি এ্যাপলের হাল ধরে কোম্পানীটিকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। চলুন জেনে নিই এই অসাধারন ব্যবসাবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষটির এ্যপলের প্রধান হয়ে ওঠার পেছনের ইতিহাস।

এক নজরে টিম কুক:

১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামায় জন্ম নেয়া টিম কুক আউবার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ব্যাচেলর ডিগ্রি নেয়ার পর ডুক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুকোয়া বিজনেস স্কুল থেকে এম বি এ করেন। পড়াশুনা শেষ করে আইবিএম এ ১২ বছর চাকরি করার পর তিনি “Intelligent Electronics” এবং “Compaq Computers” এ কিছুদিন প্রশাসনিক পদে কাজ করেন এবং ১৯৯৮ সালে এ্যপলে যোগ দেন। ২০১১ সালে স্টিভ জবস অসুস্থতার কারনে অবসরে যাওয়ার সময়ে তাঁকে নিজের স্থানে মনোনীত করে যান।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন:

টিম কুক এর পুরো নাম টিমোথি ডি. কুক। তিনি ১৯৬০ সালের ১ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা অঙ্গরাজ্যের ছোট একটি শহর রবার্টসডেল এ জন্মগ্রহণ করেন। জাহাজঘাটের কর্মী ডোনাল্ড কুক ও গৃহিনী জেরালডিন কুক এর তিন পুত্রের মধ্যে টিম ছিলেন দ্বিতীয়। ১৯৭৮ সালে তিনি রবার্টসডেল হাইস্কুল থেকে তাঁর ক্লাসে ভাল ফলাফলের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থান নিয়ে পাশ করে বের হন।

 

 

tim cook young highschool
[স্কুলের ইয়ার বুকে কিশোর টিম কুক (লাল চিহ্নিত)]
হাইস্কুল শেষ করে তিনি এ্যালাবামার আউবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৮২ সালে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নিয়ে বের হন। এরপর তিনি ১৯৮৮ সালে ডুক ইউনিভার্সিটির ফুকোয়া বিজনেস স্কুল থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে “ফুকোয়া স্কলার” খেতাব জিতে  মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। ফুকোয়া স্কলার সম্মাননাটি প্রতিটি ব্যাচের সেরা দশজন শিক্ষার্থীকে দেয়া হয়।

 

কর্মজীবন: এ্যাপলে যোগ দেয়ার আগে:

পড়াশুনা শেষ করে কুক কম্পিউটার প্রযুক্তি জগতে তাঁর কর্মজীবনের শুরু করেন। তাঁর সর্বপ্রথম চাকরি ছিল আইবিএম এ, যেখানে ১২ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি একে একে বেশ কয়েকটি পদন্নোতি পেয়ে এক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির নর্থ আমেরিকান ফুলফিলমেন্ট ডিরেক্টর বনে যান। এই পদে তাঁর দায়িত্ব ছিল উত্তর ও লাতিন আমেরিকায় আইবিএম কম্পিউটারের পন্য প্রস্তুতকরন ও বাজারজাতকরনের পূর্ণ ব্যস্থাপনা ।

আইবিএম এ ১২ বছর কাজ করার পর ১৯৯৪ সালে টিম কুক ইন্টেলিজেন্ট ইলেক্ট্রনিক্স এর পন্য পুনঃ বিক্রয় বিভাগের প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন।

ইন্টেলিজেন্ট ইলেক্ট্রনিক্স এ তিন বছর কাজ করার পর তিনি কমপ্যাক কম্পিউটার করপোরেশনে করপোরেট ম্যাটেরিয়ালস এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন যেখানে তাঁর দায়িত্ব ছিল পন্য অধিগ্রহণ ও ব্যবস্থাপনা করা। এই চাকরিতে তিনি মাত্র ছয় মাস স্থায়ী ছিলেনকমপ্যাকে যোগ দেয়ার ছয় মাস পর তিনি এ্যাপলে চলে যান।

এ্যাপলে কর্মজীবন:

এ্যাপলে যোগ দেয়ার প্রায় বারো বছর পর ২০১০ সালে আউবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কুক বলেছিলেন –“আজ পর্যন্ত আমার জীবনের সবথেকে বড় অর্জনগুলো এসেছে একটি মাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে, আর তা হল আমার এ্যাপলে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত।”

কিন্তু এই কথাটি বলার পর্যায়ে আসতে তাঁকে অনেক চড়াই উৎরাই পার হতে হয়েছে। ১৯৯৮ সালের প্রথম ভাগে যখন তিনি এ্যাপলে যোগ দেন তখন এ্যাপলের বর্তমানের বিশ্ব কাঁপানো পন্য আইম্যাক, আইপড, আইফোন এবং আইপ্যাডের মত কোনও পন্য বাজারে ছিল না। বরং তখন এ্যাপলের অবস্থা রীতিমত ধ্বংসের সম্মুখীন। ১৯৮৫ সালে স্টিভ জবস এ্যাপল ছেড়ে যাওয়ার পর যে পতনের শুরু হয়েছিল, তা এই সময়ে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ১৯৯৭ সালে স্টিভ জবসকে পুনরায় ফিরিয়ে এনে এ্যাপলের সিইও বানানোর পর তিনি তখনও ঠিকমত গুছিয়ে উঠতে পারেননি। কোম্পানীর লাভের মাত্রা দিন দিন কমে আসছিল। ব্র্যান্ড হিসেবে ক্রেতাদের কাছে আস্থা হারাচ্ছিল। এমন একটি সময়েই টিম কুক এ্যাপলে যোগ দিয়েছিলেন।

কুকের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি এ্যাপলে যোগ দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে আগে অনেকেই বহুবার তাঁকে এই সিদ্ধান্ত না নেয়ার পরামর্শ দিয়েছিল, তার কারণ সেই সময়ের অবস্থাদৃষ্টে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যতে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।

এই প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন -“এ্যাপল যখন ম্যাক তৈরীর কাজ শুরু করছিল তখন প্রতিষ্ঠানটির পন্য বিক্রয়ের হার এতই নিন্ম পর্যায়ে নেমে এসেছিল যে অনেকেই ভেবেছিলেন প্রতিষ্ঠানটি বিলুপ্তির একদম কাছে চলে এসেছে। আমি এ্যাপলের প্রস্তাব গ্রহণ করার মাত্র কয়েক মাস আগে ডেল কম্পিউটারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মাইকেল ডেলকে যখন জনসম্মক্ষে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে তিনি হলে কিভাবে এ্যাপলের সমস্যার সমাধান করতেন – তাঁর উত্তর ছিল – “আমি (প্রতিষ্ঠানটি) বন্ধ করে শেয়ারহোল্ডারদেরকে তাদের অর্থ ফিরিয়ে দিতাম।”

সবাই যখন এ্যাপল এর শেষ দেখে ফেলেছিল এবং কেউ কোনও আশাই দেখছিল না, কুক ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দেয়ার অল্প পরেই সেই চিত্র বদলাতে শুরু করল। তিনি কাজ শুরু করার এক বছরেরও কম সময়ের মাথায় এ্যাপলের হিসাবের খাতায় লাভের অঙ্ক দেখা দিতে শুরু করল, যেখানে তার আগের অর্থবছরেই আর্থিক ক্ষতির পরিমান ছিল একশ কোটি ডলারের আশেপাশে।  ভাইস প্রেসিডেন্ট থেকে এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, এবং তারপর চিফ অপারেশনাল অফিসার হিসেবে নিজেকে উন্নীত করার যাত্রাপথে কুক বিশ্বব্যাপী পন্য বিপনননের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ম্যাকিনটোশ বিভাগের পূর্ণ দায়িত্ব নেন এবং সেইসাথে বিক্রেতাদের সাথে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক উন্নয়নের কাজ করে যান।

২০১১ সালের আগস্টে স্টিভ জবসের মৃত্যুর পর যোগ্যতম ব্যক্তি হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বে মনোনীত হন। এর আগেও তিনি স্টিভ জবসের ক্যান্সারজনিত অসুস্থতার সময়ে জবসের নিজের ইচ্ছায় আপৎকালীন প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিতি প্রতিষ্ঠানের বোর্ড অব ডিরেক্টরস – এরও একজন সদস্য।

২০১৪ সালের মে মাসে এ্যাপল তাদের এযাবতকালের ইতিহাসে সবথেকে বড় অধিগ্রহণের ঘোষণা দেয়। ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে তারা আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিটস্ মিউজিক এবং বিটস্ ইলেক্ট্রনিক্সকে কিনে নেয়। এই চুক্তির অধীনে বিটস্ এর দুই সহউদ্যোক্তা, র‌্যাপার “ডা. ড্রে” এবং শীর্ষ শব্দ প্রকৌশলী জিমি লভিন প্রশাসনিক পদে এ্যাপলে যোগ দেন। এই দুইজন মিউজিক জায়ান্টের সাহায্যে এ্যাপল মিউজিক নিজেদের অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

২০১৭ সালের শুরুর দিকে দেখা যায় পৃথিবীর অডিও বাজারের ৪০ শতাংশই এ্যাপল মিউজিকের দখলে। বিটস্ অধিগ্রহণের পর কুক তাঁর প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের উদ্দেশ্যে লেখা এক খোলা চিঠিতে লেখেন – “আজ বিকেলে আমরা ঘোষণা করেছি যে এ্যাপল দুইটি অতি সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান বিটস্ মিউজিক এবং বিটস্ ইলেক্ট্রনিক্স কিনে নিচ্ছে। এর ফলে আমাদের প্রোডাক্ট লাইন সমৃদ্ধ হবে এবং এ্যাপলের কর্মপরিধি বৃদ্ধি পাবে। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলির একত্রীকরনের ফলে দারুন সব উন্নয়নের ভিত সৃষ্টি হল যা আমাদের ক্রেতারা সাদরে গ্রহণ করবে।”

এই অধিগ্রহণের পর ২০১৪ সালের জুন মাসে ডেভলপারদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কুক এ্যাপলের কম্পিউটার এবং মোবাইলের অপারেটিং সিস্টেমের নবতম সংস্করণ “OS X Yosemite” এর উদ্বোধনী ঘোষণা দেন। সেই বছরের সেপ্টেম্বরেই কুক আইফোন সিক্স এবং আইফোন সিক্স প্লাস এর মোড়ক উন্মোচন করেন। আগের আইফোনগুলোর থেকে এই ফোনটির স্ক্রিণ অনেক বড় ছিল এবং “এ্যাপল প্লে” ও “ব্রাস্ট সেলফিজ” এর মত বেশকিছু নতুন ফিচার এতে যুক্ত করা হয়েছিল। ২০১৪ সালেই কুক তাঁর সিইও হওয়ার পর প্রথম একটি সম্পূর্ণ নতুন পন্যের ঘোষণা দেন। ২০১৫ সালে বাজারে আসা সেই এ্যাপল ওয়াচ বেশ জনপ্রিয়তা পায়। সময় দেখা এবং ফোনের সাথে কানেক্ট হয়ে কল করা ও রিসিভ করা সহ বেশ কয়েকটি সুবিধার সাথে এই ডিভাইসটি ব্যবহারকারীর স্বাস্থের উন্নতি বা অবনতির তথ্যও ব্যবহারকারীকে সরবরাহ করতে পারে।

apple watch

এ্যাপল ওয়াচের পরেও কুক একের পর এক নতুন পন্যের উন্নয়নের কাজ তদারকি করে গেছেন। যার মধ্যে “ক্লিপস” নামের একটি জনপ্রিয় এ্যাপ রয়েছে – যার মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য ছোট ছোট ভিডিও বানানো সম্ভব। ক্লিপসের ঘোষণা দেয়ার কয়েক মাস পর এ্যাপল আরও একটি বড় ঘোষণা দেয় যা সারা বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ১২ই সেপ্টেম্বর এ্যাপল তাদের আইফোনের নতুন সংস্করণ – আইফোন এক্স এর মোড়ক উন্মোচন করে, যার অন্যতম আকর্ষনীয় ফিচার ছিল “ফেস রিকগনিশন” – এই ফিচারের বৈশিষ্ট হলো ফোনটি তার মালিকের চেহারা চিনে আনলক হয়ে যাবে। এই ফিচার নিয়ে বেশ কয়েকদিন বিশ্বব্যাপী বেশ আলোড়ন হয়।

iphone x pictures
[আইফোন এক্স]

বিতর্ক:

টিম কুক এ্যাপলের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নেয়ার পর এ্যাপল বেশ কয়েকটি বড় বিতর্কের সম্মুখীন হয়। ২০১৩ সালের দিকে এ্যাপলের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সংরক্ষণ করার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। ২০১৩ সালে সিনেটের সামনে পেশ করা এক বিবৃতিতে কুক এ্যাপলের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কর আইনকে পাশকাটানোর চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন এ্যাপল একটি বড় প্রতিষ্ঠানের যতটা উচ্চহারে কর প্রদান করা উচিৎ ততটাই প্রদান করে আসছে।

২০১৭ সালে “প্যারাডাইস পেপারস” ফাঁস হওয়ার পর নতুন করে আবার এ্যাপলের কর কৌশল বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য বেরিয়ে পড়ে। ফাঁস হওয়া নথি থেকে দেখা যায় এ্যাপল আইরিশ সরকারের সাথে তাদের বিশেষ চুক্তির ভিত্তিতে সেখানে রাখা অর্থের বিনিময়ে মাত্র ০.০০৫ শতাংশ কর সুবিধা ভোগ করে আসছিল। ২০১৪ সালে যখন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এই বিষয়ে তদন্ত শুরু করে, এ্যপল তখন তাদের আয়ারল্যান্ডে থাকা সম্পদ নরমান্ডির চ্যানেল দ্বিপপুঞ্জে সরিয়ে নেয়। পরবর্তীতে ইইউ এ্যাপলের ওপর প্রায় ১৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কর পরিশোধের আদেশ জারি করে।

প্যারাডাইস পেপারের বিপত্তির নিষ্পত্তি করে এ্যাপল একটি বিবৃতি প্রকাশ করে; যার বক্তব্য ছিল – “এ্যাপল বিশ্বাস করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব রয়েছে তাদের কর ঠিকমত পরিশোধ করার, এবং বিশ্বের সবথেকে বড় কর পরোশোধক হিসেবে এ্যাপল তাদের দেনার প্রতিটি ডলার প্রতিটি (কর) পাওয়ানাদার দেশকে গুনে গুনে পরিশোধ করে।

ব্যহারকারীদের হাতে থাকা পুরাতন আইফোনগুলোর গতি এ্যাপল ইচ্ছে করেই কমিয়ে দিচ্ছে – এমন স্বীকারোক্তির পর ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে এ্যাপলের নামে বেশ কয়েকটি আইনী মামলা হয়। বাহ্যত আইফোনের বেশিরভাগ গ্রাহকই ব্যবহারের কিছুদিন পর ব্যাটারির ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝামেলায় পড়ছিলেন, এছাড়া ফোনের পারফর্মেন্সও নির্দিষ্ট ব্যবহারের পর অনেকটাই পড়ে যাচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানটির দিকে এমন অভিযোগের তীর উঠেছিল যে তারা বেশি দামে নতুন পন্য কিনতে বাধ্য করার জন্য ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা করছে।

সেই একই সময়ে প্রকাশ হয় যে কুক “নিরাপত্তা ও কাজের সুবিধার খাতিরে” বানিজ্যিক এবং ব্যক্তিগত – দুই ধরনের যাতায়াতের জন্য শুধুমাত্র প্রাইভেট জেটেই ভ্রমণ করেন। ২০১৭ সালে এ্যাপল সিইওর ব্যক্তিগত ভ্রমণের খরচ ৯৩,১০৯ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য খরচ হয়েছিল প্রায় দুই লক্ষ পঁচিশ হাজার ডলার!

অর্থ ও প্রতিপত্তি:

২০১১ সালের নভেম্বরে ফোর্বস ম্যাগাজিন কুককে পৃথিবীর সবথেকে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের একজন বলে ঘোষণা করে।

২০১২ সালের এপ্রিলে নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে তাঁকে বড় পাবলিক লিমিটেড কোম্পানীগুলোর প্রধান নির্বাহীদের মাঝে সর্বোচ্চ বেতনভোগী একজন হিসেবে অভিহিত করে। যদিও সেই সময়ে তাঁর বেতন নয় লক্ষ ডলার ছিল কিন্তু শোনা যায়, শুধুমাত্র ২০১১ সালেই তিনি বেতনের পাশাপাশি স্টকের লভ্যাংশ থেকে ৩৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছেন। ২০১৫ সালে তিনি ঘোষণা করেন তাঁর ভাগ্নের কলেজে পড়ার খরচ দিয়ে দেয়ার পর তাঁর বাকি সমস্ত সম্পদ তিনি জনহিতকর কাজে দান করে দেবেন।

কুক এর ভবিষ্যৎ জনহিতকর পরিকল্পনা:

২০১৮ সালের একদম শুরুতে এ্যাপল আগামি পাঁচ বছর সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ৩৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ এবং ২০০০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০১৮ সালেই এ্যাপল ৫৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং সেইসাথে যুক্তরাষ্ট্রে সম্পূর্ণ বিকল্প জ্বালানিভিত্তিক একটি নতুন কারখানা করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। এছাড়াও এ্যাপল ঘোষণা দিয়েছে তারা তাদের “এ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং ফান্ড” এর আওতা বাড়িয়ে কোডিং কার্যক্রমের আওতা বাড়াবে যার ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা কম্পিউটারে আরও কার্যকর দক্ষতা অর্জন করবে।

পরিশিষ্ট:

টিম কুক এখনও সামনে থেকেই এ্যাপলকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। অনেকের মতেই তাঁর মাঝে স্টিভ জবসের সাফল্যকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার মত প্রতিভা আছে। এখন সময়ই বলে দেবে সেই ধারনা কতটা সঠিক। তবে এটুকু নিঃসন্দেহে বলা যায় যে এ্যাপলের বর্তমান প্রধান নির্বাহী  বর্তমান যুগের একজন শ্রেষ্ঠ বিজনেস মাস্টারমাইন্ড।


টিম কুক এর জীবনী আপনার কেমন লাগলো তা আমাদের কমেন্ট করে জানাবেন। যদি মনে হয় তাঁর জীবন থেকে সত্যিই অনুপ্রাণিত হওয়ার কিছু আছে, তাহলে লেখাটি শেয়ার করুন। আমরা যদি কোনও তথ্য মিস করে থাকি, কমেন্টের মাধ্যমে জানিয়ে দিলে তা আমরা লেখাটির সাথে যোগ করে দেব। সাফল্যের পথে প্রতিটি পদক্ষেপে লড়াকু আপনার সাথে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *