কিভাবে বুঝবেন আপনি সত্যিই লক্ষ্য পূরণের পথে আছেন কিনা


  • By
  • May 16th, 2018
  •    
  • পড়তে সময় লাগবে: 4 minutes
  • 1,666 views
4 mins read

এক নজরে লেখাটির বিষয়ে:

প্রতিটি মানুষই বলে তার জীবনে একটি লক্ষ্য রয়েছে।  কিন্তু সবাই সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। এর পেছনে নানান জনে নানান কারনের কথা বলবে। কিন্তু আসল যে কারনটি, যেটি অনেকের কাছেই অজানা থেকে যায়, আবার অনেকে জেনেও অস্বীকার করে – তা হলো, লক্ষ্যটি সে সত্যিকার অর্থে চায়নি।  একজন মানুষ যদি চাওয়ার মত করে কিছু পেতে বা করতে চায়, তবে সেটি পূরণের পেছনে সে তার পুরোটা ঢেলে দেয়।  আর এটা না করতে পারলে ব্যর্থতা অনিবার্য।  কিন্তু কি কারনে আমরা চাইতে পারি না? কেন বুঝতে পারি না যে চাওয়াটা চাওয়ার মত হচ্ছে কিনা? – এসব কারন আর এর সমাধানই আমরা এই লেখার মাধ্যমে জানবো।


এমন মানুষ প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে যারা কিনা সামনে কি করতে চলেছে, কত বড় বড় কাজ করতে চলেছে – এসব নিয়ে সব সময়েই কথা বলতে থাকে। এমন কি কখনও আপনার সাথে হয়েছে যে আপনার কোনও বন্ধু আপনাকে একদিন বলল যে সে কিছুদিনের মাঝেই নতুন একটি ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছে, এবং তার প্ল্যান ঠিক মত কাজে লাগালে দারুন একটা কিছু হবে। তার প্ল্যান শুনে আপনারও তাই মনে হলো। এরপর কয়েক মাস কেটে গেল – সেই বন্ধুর সাথে আপনার আবার দেখা।  আপনি হয়তো ভাবছেন সে এতদিনে দারুন কিছু করে ফেলেছে।  কিন্তু বাস্তব চিত্র তার সম্পূর্ণ উল্টো।

তাকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন সে আসলে কাজই শুরু করেনি।  তবে কিছুদিনের মাঝেই সে তা করবে। সেইসাথে তার আগের প্ল্যানের সাথে আর কি কি জুড়েছে, তা-ও সে আপনাকে বিস্তারিত বলতে শুরু করে দিল। এবার কিন্তু আপনি আর আগের মত আগ্রহ পাবেন না।  এবং সেটা না পাওয়াটাই স্বাভাবিক। আমরা নিজেরা যেমন কথাকে কাজে রূপান্তর করা মানুষকে বেশি পছন্দ করি, ‘সাফল্যও’ তেমনটাই করে।  সফল হতে গেলে বা লক্ষ্য অর্জন করতে গেলে আপনাকে আগে সত্যিকার ভাবে তা চাইতে হবে।  চলুন, ব্যাপারটি আরও বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা যাক।

শুধু স্বপ্ন দেখাই যথেষ্ঠ নয়

যে মানুষ সব সময়ে বড় কিছু করার কথা বলে, সে যে সেটা একেবারেই চায় না, তা নয়। সে সেটা আসলেই চায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মানুষটি শুধু স্বপ্নটাই দেখে সুখী থাকতে চায়।  সে নিজেও জানে না, সে আসলে নিজের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য কাজ না করার একটা সিদ্ধান্ত অবচেতনে নিয়ে রেখেছে।  আপনার লক্ষ্য অর্জন করলে কতটা ভাল লাগবে – এ নিয়ে চিন্তা করে সময় কাটালে বাস্তবে আপনি কখনওই সুখী হতে পারবেন না।

আপনি যদি একটি ব্যবসা করতে চান – শুরু করে দিন।

আপনি যদি শিল্পী হতে চান – আজ থেকেই কাজ শুরু করুন।

আপনি যদি ভ্রমণ করতে চান – যেখানে যাওয়া সম্ভব আজই চলে যান।

আপনি অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে চান – আজ থেকেই চর্চা শুরু করুন।

খুব বেশি বিশ্লেষণ করতে গেলে আপনার কাজ কখনওই শুরু করতে পারবেন না। আর অব্যর্থ পরিকল্পনা বলতে কিছুই নেই। কাজে নামার পর ভুলগুলো থেকে শিখতে শিখতেই এক সময়ে গিয়ে আপনার হাতে একটি অব্যর্থ পরিকল্পনা এসে যাবে।

যদি কোনও লক্ষ্য  বা স্বপ্ন বাস্তবেই পরিনত না হয়, তো তা দেখে বা স্থির করে লাভ কি? আপনার স্বপ্ন বা লক্ষ্যের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়াটা হলো প্রথম পদক্ষেপ, আর ফলাফলের কথা চিন্তা না করে কাজ শুরু করা হলো দ্বিতীয় পদক্ষেপ।  প্রথম পদক্ষেপে আপনি পথে নামবেন, আর দ্বিতীয় পদক্ষেপ থেকেই শুরু হবে আপনার আসল পথচলা।

অজুহাত দেয়া বন্ধ করুন, অজুহাত আপনার হাত বেঁধে রাখে

অজুহাত শরীরে বাসা বেঁধে থাকা মরণঘাতী ক্যান্সারের মত। আপনি যে লক্ষ্য অর্জন করতে চান, সেটা না করতে চাওয়ার কারন খুঁজে বের করাটা খুব কঠিন কিছু নয়।  এই কারনগুলিই আসলে অজুহাত।

আপনি যে কোনও কিছুই অর্জন করতে যান না কেন, আপনাকে কষ্ট করতে হবে।  আপনাকে কঠিন থেকে কঠিন সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে।  আপনাকে শুধু একটি কথাই মনে রাখতে হবে, এত কষ্টের পর আপনি যখন সত্যিই আপনার লক্ষ্য অর্জন করবেন, সেই অনুভূতির কোনও তুলনা নেই।

আপনার মনে হতেই পারে যে আপনার লক্ষ্যটি শেষ পর্যন্ত পূরণ হবে না। এবং এর পেছনে হাজারটা যুক্তি দাঁড় করাতে পারবেন খুব সহজেই।  এই যুক্তিগুলো সব সময়েই ছিল, এবং থাকবে।  আর আপনি যদি এই যুক্তিগুলো মেনে নিয়ে কাজ করা বন্ধ করে দেন – তবে ধরে নেবেন আপনাকে আসলে ভয় আর অলসতায় পেয়ে বসেছে।  লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার পক্ষে যদি যুক্তি থাকে, তবে পূরণ হওয়ার পক্ষেও যুক্তি রয়েছে।

অজুহাতগুলো নিয়ে চিন্তা না করে, চিন্তা করুন সম্ভাবনা নিয়ে। নিজের সাথে সাথে অন্যদেরও বলুন কেন আপনি আপনার লক্ষ্যটি অর্জন করতে চান।  আপনি আপনার লক্ষ্য নিয়ে যে চিন্তা করবেন, দিন শেষে সেটিই ফলাফলে পরিনত হবে।

তুলনা করতে যাবেন না

অনেককেই দেখা যায়, একটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে করতে নিজের ফলাফলের সাথে অন্যদের ফলাফলের তুলনা করে।  এটা আপনার উদ্দীপনাকে একদম নষ্ট করে দিতে পারে।  একই পথে চললেও সবার যাত্রা একরকম হয় না। প্রতিটি মূহুর্তে মানুষের মানসিকতা ও পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়। আপনি যদি একটি আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেন, আপনি এক বছরে যেখানে পৌঁছেছেন, আপনার আগে অন্য কেউ সেই জায়গায় আরও অনেক সহজে, অনেক কম সময়ে পৌঁছে গেছে – তাহলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু অনেকেই এই ভুলটি করে। অন্যের সাফল্য বা ব্যর্থতা দেখে নিজেই হতাশ হয়ে যায়। প্রতিটি মানুষের কাজের ধরন আলাদা। প্রতিটি মানুষ প্রতি মূহুর্তে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির মাঝে পড়ে। কাজেই একজনের কাজের ফলাফল যে হুবহু অন্য আরেকজনের মত হবে, সেটা কখনওই বাস্তব সম্মত নয়।

সত্যি কথা বলতে, প্রতিটি মানুষকেই তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়।  একজন হয়তো কোনও একটি গন্তব্যে আগে পৌঁছায়, কেউ বা পরে।  কিন্তু কাজ করে যেতে থাকলে সফলতা আসবেই।  অন্যের সাথে নিজের তুলনা করে হতাশ হওয়ার চেয়ে ভাল খুঁজে দেখা যে সত্যিই কোনও ভুল হচ্ছে কি-না।  যদি ভুল হয়ে থাকে, তবে সেটি শুধরে নিয়ে আবার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।  কিন্তু কোনওভাবেই থেমে যাওয়া যাবে না।

Image result for dont compare quotes

আরেকটি কথা, আপনি যার সাথে নিজের তুলনা করছেন, তাকে আপনি দিনের প্রতিটি মূহুর্ত সামনে পাচ্ছেন না। আবার এমনও হতে পারে, আপনি হয়তো বাস্তবে তাকে কখনও দেখেনওনি।

প্রতিটি মানুষের নিজস্ব একান্ত একটি জীবন আছে। মানুষের জীবনে এমন কিছু ব্যাপার থাকে, যা সে অন্য কারও কাছে বলে না। একজন মানুষের পক্ষে অন্য একজন মানুষ সম্পর্কে কখনওই শতভাগ জানা সম্ভব নয়।  কাজেই অন্যের দিকে না তাকিয়ে, বুদ্ধিমানের কাজ হবে নিজের দিকে তাকানো। নিজের লক্ষ্য পূরণে আপনি নিজে কি করতে পারেন সেগুলো চিন্তা করা। আপনি হয়তো অন্যকে দেখে শিখতে পারেন, কোনও বিষয় সম্পর্কে ধারনা নিতে পারেন, আপনার পরিকল্পনা ঝালাই করতে পারেন – কিন্তু সেটা যেন কখনওই আপনার নিজস্বতাকে নষ্ট না করে। একজনের জন্য যেটা কাজ করেছে, আপনার জন্য যে তা একই ভাবে কাজ করবে এমন কোনও কথা নেই – বরং সেটি না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।  অন্যের সাথে নিজের তুলনা করলে নিজের ওপর থেকে নজর সরে যায়। অন্যের সাথে নিজের তুলনা করতে গেলে শুধু সময়ই নষ্ট হবে।

শক্তি ও উ‌ৎসাহের অভাব

একটি লক্ষ্য আপনি ঠিক করলেন, ভাল কথা। কিন্তু আপনার মনে যদি থাকে যে সেই লক্ষ্য অর্জন না হলে আপনার তেমন কিছু আসবে যাবে না – তাহলে ধরে নিন আপনি নিশ্চিতভাবেই ব্যর্থ হবেন।  একটি লক্ষ্য ঠিক করার পর যদি আপনার মনে এমন একটি ধারনা থাকে তবে সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ও উ‌ৎসাহ কখনওই আপনার মাঝে জন্ম নেবে না।

আপনি যদি কোনও ভাবে এটা মেনে নিতে প্রস্তুত হয়ে যান যে আপনার লক্ষ্যটি আপনি পূরণ করতে পারবেন না, এবং সেটা ঘটলে তেমন কোনও ক্ষতিও হবে না – জেনে রাখুন, সেখানেই আপনার শেষ।  এমনকি এর ফলে আপনার কাছে জীবনের অর্থও ‘নেই’ হয়ে যেতে পারে।  কাজেই ব্যাপারটিকে কখনওই সহজ ভাবে নেবেন না। আপনার যদি মনে হয় যে কোনও একটি লক্ষ্য পূরণ না হওয়া এমন কোনও ‘ব্যাপার নয়’।  তাহলে সেটি আসলে কোনও লক্ষ্যই ছিল না। সেটি ছিল একটি দিবা স্বপ্ন।

আপনি যদি সত্যিই আপনার লক্ষ্য পূরণ করতে চান, তবে কোনও অবস্থাতেই সেই লক্ষ্যের থেকে সরে আসবেন না। হয়তো পরিস্থিতি বা কোনও ভুলের কারনে আপনার কৌশল বদলাতে হতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য যেন কখনওই না বদলায়।  এই সহজ ভাবে নেয়ার অভ্যাসটি একবার হয়ে গেলে আপনি সব ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হতে থাকবেন।  এই অভ্যাসটি মরণ ব্যাধির মত আপনার জীবনকে কুরে কুরে খাবে।

যখনই আপনি আপনার লক্ষ্য পূরণের পথে আশানূরুপ ফলাফলের দেখা না পান, তখনই একটু একটু করে হতাশা মনের ভেতরে জন্ম নিতে থাকে। কিন্তু আমরা সেই হতাশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রায়ই নিজের মনকে সান্তনা দিই এই বলে যে লক্ষটি পূরণ না হলে তেমন কোনও ক্ষতি হবে না।  কিন্তু বুঝতেও পারিনা এটা আমাদের ভেতর থেকে শক্তি আর উ‌ৎসাহকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আগে লক্ষ্যকে সেভাবে চাইতে হবে। জীবনের একটি অংশ বানিয়ে ফেলতে হবে।  লক্ষ্য পূরণের ক্ষুধাকে কখনওই নিজের ভেতর থেকে মরতে দেয়া যাবে না।

হতাশার মাঝে পড়লেও ফিরে আসার শক্তি কিন্তু আপনার নিজের মাঝেই রয়েছে। আপনাকে শুধু এই মনভাবটি নিজের ভেতরে গড়ে তুলতে হবে যে আপনার লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার কোনও কারন নেই। বিশ্বাস করতে হবে যে কাজ করে গেলে এক সময়ে না এক সময়ে লক্ষ্য পূরণ হবেই।  হতাশ হওয়া যেমন ক্ষতিকর, তেমনি পুরোপুরে গা-ছাড়া হয়ে যাওয়াটাও সমান ক্ষতিকর – কাজেই আপনাকে হতাশা ও হাল ছেড়ে দেয়ার মাঝের অবস্থাটি বুঝতে হবে।  হতাশ হয়ে মানুষ হয় সেই হতাশাকে জয় করে আবার কাজে ঝাঁপ দেয়, অথবা হাল ছেড়ে দেয়। আর অনেকে এই হাল ছেড়ে দেয়াটাকেই মুখোশ পরিয়ে দেয় যে লক্ষ্য পূরণ না হলে কিছু আসে যায় না। যদি কখনও আপনার মাঝে এমন মনোভাবের জন্ম হয় – তবে মনোভাবটিকে ঝেড়ে ফেলে নতুন পরিকল্পনা করুন, কিন্তু লক্ষ্যকে তার জায়গায় রাখুন।

পরিশিষ্ট:

আপনি যদি সত্যিই আপনার লক্ষ্য পূরণ করতে চান, তবে কাজে নেমে পড়ুন। দ্বিধা আর সন্দেহ মনের মাঝে আসবেই। এগুলোকে কোনওভাবেই বন্ধ করা সম্ভব নয়। যা সম্ভব, তা হলো এগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া।  দ্বিধা আর সন্দেহকে অজুহাতে পরিনত হতে দেবেন না। প্রতিদিন কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন আপনার লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। নিজেকে বলুন যে আপনি পারবেন – পৃথিবীতে কোনওকিছুই অসম্ভব নয়। শুধু চাওয়ার মত করে চাইতে হয়।  এমন ভাবে চান, যেন এটাই আপনার জীবনের অর্থ হয়ে দাঁড়ায়।  যদি সাময়িক হতাশা বা ব্যর্থতা আসে, তবে পরাজয় মেনে নেবেন না। এটাও ভাববেন না যে লক্ষ্য অর্জন না হলে কিছু হবে না।  আসলে সত্যিকার ভাবে চাইতে পারলেই আপনার মাঝে সেই চাওয়া পূরণের শক্তি জন্ম নেবে, আপনি সবকিছু তুচ্ছ করে সেই চাওয়া পূরণের দিকে এগিয়ে যাবেন – আর এক সময়ে দেখবেন চাওয়াটি সত্যিই পূর্ণ হয়ে গেছে।

নিজেকে প্রশ্ন করুন: “আমি কি সত্যিই এটা চাই?” এবং নিজেই উত্তর দিন: “অবশ্যই চাই” – এই বিশ্বাসই আপনার চাওয়াকে একদিন পাওয়ায় পরিনত করবে।


লেখাটি কেমন লাগলো, তা আমাদের কমেন্ট করে জানান। আপনার প্রতিটি মতামতই আমাদের জন্য অমূল্য। আর যদি মনে হয় এই লেখাটি মানুষের উপকারে আসবে, তাহলে শেয়ারের মাধ্যমে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন। আমাদের সাথে থাকুন, সাফল্যের পথে প্রতিটি পদক্ষেপে লড়াকু আপনার সাথে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *