সবকিছুকে ভুলে গিয়ে পূর্ণ মনযোগে কাজ করার উপায়: ডিপ ওয়ার্ক – (বুক রিভিউ)


  • By
  • May 13th, 2018
  •    
  • পড়তে সময় লাগবে: 9 minutes
  • 3,470 views

কখনও কি এমনটা হয়েছে যে কোনও একটি জরুরী কাজ বা পড়াশুনা করার সময়ে আপনার মনে হচ্ছে ‘যাই ফেসবুকটা একটু চেক করে আসি’। অথবা এমনও হয়েছে দুইটি কাজ একসাথে করছেন কিন্তু কোনওটাই ঠিকমত হচ্ছে না? – বিশেষ করে কম্পিউটারে কাজ করার সময়ে এমনটা হয়। সাধারণ ভাবে তেমন ক্ষতিকর মনে না হলেও – এগুলো আপনার কাজের দারুন ক্ষতি করে। আর বর্তমান যুগে নির্বিঘ্নে এক মনে কাজ করাটা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু যে কোনও কাজে সেরা ফলাফলটা বের করে আনতে গভীর ভাবে এক মনে কাজ করাটা খুবই জরুরী। অধ্যাপক কার্ল নিউপোর্ট তাঁর “Deep Work” বইতে এই সমস্যার চম‌ৎকার ব্যাখ্যা ও সমাধান দিয়েছেন। এই বুক রিভিউতে আমরা সেটাই আলোচনা করব।


“Deep Work: Rules for Focused Success in a Distracted World” অধ্যাপক কার্ল নিউপোর্ট এর বেস্ট সেলিং বই। বইটিতে লেখক দক্ষতার সাথে কিভাবে সেরা কাজটি করা যায় সেই ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। লেখকের মতে ‘গভীর ভাবে’ কাজ করলে সেরা ফলাফল পাওয়া যায়। গভীর ভাবে কাজ করা বলতে লেখক বুঝিয়েছেন একটি কাজ করার সময়ে সর্বোচ্চ মনোযোগ রেখে, শুধুমাত্র সেই কাজটির ওপর ফোকাস দিয়ে কাজটি করা।

বইটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে লেখক ব্যাখ্যা করেছেন গভীর ভাবে কাজ করলে কেন সেরা ফলাফল পাওয়া যায়, এবং কেন অল্প কিছু মানুষই তা করতে পারে। আর দ্বিতীয় ভাগে লেখক দেখিয়েছেন ঠিক কিভাবে গভীরতার সাথে কাজ করা যায়, এবং এই অভ্যাসটিকে কিভাবে আমাদের জীবনের অংশ করে ফেলা যায়।

লেখক সম্পর্কে কিছু তথ্য

লেখক কার্ল নিউপোর্ট বর্তমানে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সাইন্স বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। এই বইটি ছাড়াও তাঁর আরও কিছু বেস্ট সেলিং বই আছে, যার মধ্যে “So Good They Can’t Ignore You” বইটি অন্যতম। এছাড়াও তিনি Study Hacks ব্লগ এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক।

এই বইটি আপনাকে সকল জাগতিক কোলাহল আর মনোযোগ নষ্টকারী বিষয় থেকে দূরে গিয়ে আপনার কাজ গুলো সঠিক ভাবে করার উপায় বলে দেবে। এই লেখায় আমরা বইটির মূল বিষয় ও কৌশলগুলো নিয়ে আলোচনা করব।

ডিপ ওয়ার্ক আসলে কাদের জন্য?

# যাঁরা নিজেদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে চান, বিশেষ করে রিসার্চ ওয়ার্কের সাথে জড়িতরা।

# যাঁরা অল্প সময়ে অনেক বেশি কাজ করতে চান।

# যাঁরা মাল্টিটাস্কিং, মনোযোগ, এবং কর্মদক্ষতার ব্যাপারে আগ্রহী।


আপনার বোঝার সুবিধার জন্য বইটির আলোচনাকে আমরা ১০টি ভাগে ভাগ করেছি। একে একে এই ১০টি ভাগ ভালোমত পড়লে আপনি বইটির থিওরি ও প্রাকটিক্যাল দিকগুলো সম্পর্কে একটি স্পষ্ট আইডিয়া পাবেন। প্রথম ৫টি ভাগ, অর্থা‌ৎ প্রথম অংশে ডিপ ওয়ার্ক কি, এবং ডিপ ওয়ার্ক এর প্রয়োজনীতা আলোচনা করা হয়েছে।
এবং দ্বিতীয় ভাগে আলোচনা করা হয়েছে কিভাবে এই দক্ষতাটি অর্জন করবেন এবং কাজে লাগাবেন – সেই বিষয়ে। চলুন শুরু করা যাক।

প্রথম অংশ: ডিপ ওয়ার্ক কি, এবং কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ?

০১. ডিপ ওয়ার্ক বা গভীরতাপূর্ণ কাজ আসলে কি?

# ডিপ ওয়ার্ক বা গভীরতাপূর্ণ কাজ:

অন্য কোনও দিকে কোনওরকম মনোযোগ দেয়া ছাড়া পূর্ণ মনোযোগে এক সময়ে একটি মাত্র কাজ করা। এভাবে কাজ করাটা আপনার মানসিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে। এতে প্রায়ই নতুন কিছু সৃষ্টি হয় যা মানুষের কাজে লাগে। সেই সাথে এই ধরনের কাজে আপনার দক্ষতা বাড়বে, এবং এটা রপ্ত করা আসলেই কঠিন”।

# শ্যালো ওয়ার্ক (Shallow Work) বা ‘ভোঁতা কাজ’:

এই ধরনের কাজে খুব বেশি জ্ঞান বা বুদ্ধির দরকার হয় না। সেইসাথে এই কাজগুলো করতে বেশিরভাগ সময়েই যন্ত্রপাতির সাহায্য লাগে, কিন্তু খুব বেশি মনোযোগ দিতে হয় না। এই ধরনের কাজ গুলো পৃথিবীকে নতুন ও কার্যকর কিছু দিতে পারে না, আর এগুলো রপ্ত করাও খুব বেশি কঠিন কিছু নয়।


লেখক নিউপোর্ট এই দুই ধরনের কাজের মাঝে বেশকিছু পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর চোখে গভীরতা পূর্ণ কাজ হলো এমন কাজ যাতে আপনি এক ধ্যানে পূর্ণ মনোযোগের সাথে লেগে থাকেন, এগুলো অল্প সময়ে অনেক বেশি কার্যকর ফলাফল দিতে পারে, এবং, আগেই বলা হয়েছে, এই কাজ গুলো সবার পক্ষে রপ্ত করা কঠিন।

অন্যদিকে ভোঁতা কাজ বা Shallow Work এ কর্মীর খুব বেশি মনোযোগ থাকে না। এগুলো তেমন কোনও কঠিন বা সৃষ্টিশীল কাজও নয়। লেখকের মতে প্রতি দশ মিনিটে একবার করে মেইল চেক করা, নোটিফিকেশনে ক্লিক করে দেখা, অথবা ফেসবুক, টুইটার, নিউজ সাইট/পেপার এ সময় কাটানোর মতো অর্থহীন কাজগুলো মূলত শ্যালো ওয়ার্ক।

বইটির তত্ত্ব অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে মানুষের ডিপ ওয়ার্ক করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং এর ফলে একই সময়ে এই ক্ষমতা বা দক্ষতাটির মূল্য দারুন ভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এই কারণে যে অল্প কিছু মানুষ এই দক্ষতাটি অর্জন ও চর্চা করতে পারবে, তারা সব ক্ষেত্রে দারুন ভাবে সফল হবে।

বিজনেস এক্সপার্ট ও বেস্ট সেলিং লেখক এরিক বারকার এর মতে, ২১ শতকের সুপার পাওয়ার হলো ডিপ ওয়ার্ক করার দক্ষতা।

০২. ডিপ ওয়ার্ক কেন দুর্লভ ও মূল্যবান?

আগের পয়েন্টেই বলা হয়েছে – মানুষের মাঝে গভীরতাপূর্ণ কাজের দক্ষতা দিনে দিনে কমে যাওয়ার পাশাপাশি এর মূল্যও দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছে। – কিন্তু এর কারণ কি? – চলুন একে একে বিষয় দু’টি নিয়ে আলোচনা করা যাক।

# গভীরতাপূর্ণ কাজ কেন দুর্লভ হয়ে পড়ছে?

প্রথম কথা, ভোঁতা কাজ বা Shallow Work বেশ সহজ। সেইসাথে আপাতদৃষ্টিতে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই ভোঁতা কাজকে উ‌ৎসাহিত করে ভেবে দেখুন: সব সময়ে কর্মীদের ওপর নজরদারী করা, দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তাড়া দেওয়া, বা ওপেন অফিস প্ল্যান (আলাদা আলাদা রুমের বদলে একটি বড় স্পেস নিয়ে খোলা জায়গায় ডেস্ক বসানো, এবং সবাইকে একসাথে কাজ করতে দেয়া, এই পদ্ধতিতে কর্মীরা সার্বক্ষণিক নজরদারীতে থাকে)। এইসব পদ্ধতিতে যেসব প্রতিষ্ঠান চলে, সেগুলোর কর্মীরা ভালোভাবে কাজ করার বদলে, যেভাবেই হোক কাজ শেষ করে দিতে চেষ্টা করে, সেই সাথে সব সময়ে নিজেকে ব্যস্ত দেখাতে চায়। কাজের জন্য কাজ না করে এরা ‘দেখানোর জন্য’ কাজ করে থাকে। আর বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো এমন পদ্ধতিতেই বেশি চলে।

লেখক নিউপোর্টের মতে, আজকালকার বেশিরভাগ কর্মীই ‘ব্যস্ততা দেখাতে চায়’, অন্য কথায় তারা সত্যিকার কাজের ফলাফলের বদলে ব্যস্ততা দেখানোকে বেছে নেয়। যাতে করে বসরা বুঝতে পারে যে সে অনেক কাজ করছে। সত্যিকার ফলপ্রসূ কাজ করা বলতে আসলে কি বোঝায় – এই বিষয়ে পরিস্কার কোনও নির্দেশনা না থাকার ফলে অনেক সৃষ্টিশীল, এবং তথ্য ও গবেষণাভিত্তিক কাজের কর্মীরাও সাধারণ কর্মীদের মত কাজ করতে শুরু করে দেয়। অর্থা‌ৎ তারা শুধুমাত্র দেখানোর জন্য অনেক বেশি কাজ করে। উর্ধ্বতনরাও বুঝতে পারেন না যে তাঁদের কর্মীরা যতটা ব্যস্ততা বা কাজ দেখাচ্ছেন, ততটা কাজ আসলে হচ্ছে না। আর এই কারণে এই সহজ পদ্ধতিতে মুক্তি পাওয়ার কৌশলটি দিনে দিনে কর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আর সেইসাথে সত্যিকার গভীরতাপূর্ণ কাজ করার মানুষও দুর্লভ হয়ে পড়ছে।

# গভীরতাপূর্ণ কাজ কেন মূল্যবান?

অল্প কথায় বলতে গেলে, গভীর ভাবে কাজ করলে যে কোনও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ফলাফলটি বের করে আনা যায়।

এবং এর পেছনের কারণটি খুবই সহজ। “ডিপ ওয়ার্ক করার একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে একটি মাত্র কাজ কোনও রকমের ব্যাঘাত ছাড়া, গভীর মনোযোগের সাথে করা হয়”। – এভাবে কাজ করলে মোট ৪টি বিষয় আপনার কাজের সর্বোচ্চ ফলাফল এনে দিতে সহায়তা করবে। চলুন এই ৪টি বিষয় বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক:

** একটি মাত্র কাজ করা:

অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেই এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, একই সময়ে অনেক কাজ করা, বা Multitasking মান কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে, একটি সময়ে একটি মাত্র কাজে মনোযোগ দিলে কাজের মান অনেক বেশি ভালো হয়।

Image result for multitasking

** কোনওরকম ব্যাঘাত ছাড়া কাজ করা:

এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। একটি কাজ করার সময়ে যদি মাঝখানে কোনও রকমের ব্যাঘাত, যেমন- ফোন আসা, নোটিফিকেশনে ক্লিক করা, কারও সাথে গল্প করা – ইত্যাদি না ঘটে, তাহলে অবশ্যই অনেক ভালো করে কাজ করা যাবে।

** গভীর মনোযোগ:

আপনি যদি আপনার সমস্ত মনোযোগ একটি নির্দিষ্ট কাজের ওপর রাখতে পারেন, তবে আপনি অনেক কম সময়ে অনেক বেশি কাজ করতে পারবেন। আপনার মনোযোগ যত গভীর হবে, আপনার কাজের ফলাফল ততই ভালো হবে।

** একটি নির্দিষ্ট লম্বা সময় ধরে কাজ করা:

একটি নির্দিষ্ট ও লম্বা সময় ধরে কাজ করার বেশ কিছু সুফল রয়েছে। এই ব্যাপারটি আমরা ৩ নম্বর পয়েন্টে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

০৩. অবশিষ্ট থেকে সাবধান!

নিউপোর্ট তাঁর বইতে লিখেছেন- “আপনি যখন কাজ A থেকে কাজ B তে যাবেন, আপনার মনোযোগ সাথে সাথে স্থানান্তর হবে না। আপনার চিন্তার কিছু অবশিষ্ট অংশ আগের কাজটি, অর্থা‌ৎ “ কাজ -A” নিয়ে তখনও ভাবতে থাকবে। এই অবশিষ্ট অংশ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে যখন A পুরোপুরি শেষ না করেই আপনি B তে মন দেন। তবে আপনি যদি নতুন কাজে আসার আগে আগের কাজটি শেষও করে আসেন, তবুও কিছু সময়ের জন্য আপনার মনোযোগ আগের কাজটিতে পড়ে থাকে থাকে”।

“ বিভক্ত মনোযোগ নিয়ে কাজ করার অভ্যাসটি বেশ ভালোভাবে আপনার পারফর্মেন্স নষ্ট করে। মনে হতে পারে যে কাজের সময়ে মাঝে মাঝে দুই-একবার এক-দুই মিনিটের জন্য মেসেজ/ফেসবুক চেক করা তেমন ক্ষতিকর কিছু নয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, কাজ নষ্ট করার জন্য এটা অনেক বড় অবদান রাখে।

full inbox

এই দুই-এক মিনিট অমনোযোগী হওয়াটাও আপনার কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট করবে।
এই ‘কুইক চেক’ আপনার মনোযোগকে একটি নতুন টার্গেট ঠিক করে দেয়। আরও খারাপ বিষয় হলো, আপনি যখন অল্প একটু সময়ের জন্য কোনও মেসেজ চেক করেন, প্রায়ই দেখা যায় সেগুলোর উত্তর দেয়ার সময় আপনার হাতে থাকে না। এর ফলে কাজটি শুরু করে অসমাপ্ত রেখেই আরেকটি কাজে মনোযোগ দিতে হয় – এতে করে আপনার মূল কাজটিতেও পূর্ণ মনোযোগ দেয়া হয় না। কারণ মনের ব্যাক গ্রাউন্ডে মেসেজের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা চলতেই থাকে, আপনি নিজে হয়তো তা টের পান না – কিন্তু এটা আপনাকে কাজে মন বসাতে বাধা দেয়”।

অনেক সময়ে হয়তো খেয়াল করেছেন, কোনও কাজে মন দিতে চেয়েও মন দিতে পারছেন না। আবার বুঝতেও পারছেন না যে কি কারণে আপনার এমনটা হচ্ছে। এর কারণ হলো আপনার মনের ব্যাক গ্রাউন্ডে, মানে আপনার সাব কনশাস বা অবচেতন মনে কোনও একটি চিন্তা চলছে। যে চিন্তাটি আসলে কাজের মাঝে অন্যদিকে মনোযোগ দেয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে।

কোনও কাজের মাঝে থাকা অবস্থায় যখন আপনি বারবার অল্প সময়ের জন্য অন্যদিকে মনোযোগ দেন, একটু একটু করে মূল কাজের ‘productivity’ কমতে থাকে।

আর এই আগের কাজের অবশিষ্টের ফাঁদে পড়া এড়াতে একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে ‘ডিপ ওয়ার্ক’ বা গভীর ভাবে কাজ করার কোনও বিকল্প নেই। যদি আধা ঘন্টার জন্য ডিপ ওয়ার্ক করতে চান, তবে সেই আধা ঘন্টায় আগুন ভূমিকম্পের মত কোনও দুর্যোগ সৃষ্টি না হলে কাজ থেকে কোনওভাবেই মনোযোগ সরাবেন না।

নিউপোর্ট তাঁর বইয়ে এই বিষয়ে একটি গবেষণার উল্লেখ করেছেন, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা একটি ওয়ার্ড পাজ্‌ল সেট মেলানো দিয়ে তাদের কাজ শুরু করেছিল। এরপর একটি ধাপে তাদের পাজ্‌ল মেলানো শেষ হওয়ার আগেই তাদের অন্য একটি কাজ করতে বলা হয়, যা ছিল বেশকিছু সিভি বা বায়োডাটা দেখে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কর্মী নির্বাচন করা। অন্য একটি ধাপে অংশগ্রহনকারীদের বলা হয়েছিল প্রথমে পাজ্‌ল মেলানো শেষ করে তারপর যেন তারা কর্মী নির্বাচনের খেলাটি খেলে। দুই কাজর মাঝে তাদের আগের কাজের চিন্তা কতটা প্রভাব রাখছে, তা বুঝতে গবেষকরা পাজ্‌ল ও কর্মী নির্বাচন গেমের মাঝে আরও একটি ডিসিশন মেকিং টাইপের গেম রেখেছিলেন।

সেই রিচার্চের রিপোর্টে বলা হয়েছিল: “যেসব ক্ষেত্রে একজন মানুষ আগের কাজটি অসমাপ্ত রেখে আরেকটি কাজে নামে, অথবা আগের কাজের চিন্তা মাথায় নিয়ে নতুন কাজে নামে – সেসব ক্ষেত্রে পরের কাজটিতে তার পারফর্মেন্স ও কাজের ফলাফল খুবই বাজে ধরনের হয়”।

আপনি যদি কোনও কাজে আপনার পূর্ণ দক্ষতা ব্যবহার করে সেরা ফলাফলটি পেতে চান, তবে একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে সেই একটি মাত্র কাজ, কোনওরকম ব্যাঘাত ছাড়া পূর্ণ মনোযোগের সাথে করুন। অন্য কথায়, ডিপ ওয়ার্ক করুন।

০৪. গভীরতাপূর্ণ কাজ একটি অনন্য দক্ষতা

বইয়ের এক জায়গায় লেখক বলেছেন – “ডিপ ওয়ার্ক এর অভ্যাসটি ভালোভাবে রপ্ত করে সেরা কাজটি বের করে আনার জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। আর এই প্রশিক্ষণ বা ট্রেইনিং এর লক্ষ্য হতে হবে দুইটি: গভীর ভাবে মনোযোগ দেয়ার দক্ষতা অর্জন করা, এবং মনোযোগ নষ্টকারী বিষয়গুলো সামনে আসলে- তা এড়িয়ে যাওয়ার মানসিক শক্তি অর্জন করা”।

বইয়ে লেখক একাধিক বার বলেছেন, গভীর ভাবে কাজ করার দক্ষতা অর্জন করতে হলে তা দীর্ঘ সময় ধরে যত্নের সাথে প্রাকটিস করতে হবে। নতুন কেউ যদি ডিপ ওয়ার্ক অনুশীলন করা শুরু করে তবে তার সেই কাজের গভীরতা প্রথমেই খুব বেশি হবে না। এটা রপ্ত হতে বেশ কিছুটা সময় প্রয়োজন।

অর্থা‌ৎ গভীরতাপূর্ণ কাজের দক্ষতা অর্জন করতে হলে নিয়মিত ও দীর্ঘ অনুশীলন প্রয়োজন। আপনি যদি এখন থেকে এই দক্ষতাটি অনুশীলন শুরু করেন, তবে এখনই দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখার আশা করবেন না।

প্রথম দিকে হয়তো প্রতিদিন এক কি দুই ঘন্টা ‘ডিপ ওয়ার্ক’ করতে পারবেন। কিন্তু যদি এটা চালিয়ে যান, তবে ধীরে ধীরে একটা সময়ে আপনি এই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এত কাজ করতে পারবেন, যা আপনি এখন ভাবতেও পারছেন না। শুধু ধৈর্য না হারিয়ে, হতাশ না হয়ে আপনাকে কাজটি চালিয়ে যেতে হবে – দক্ষতাটি এক সময়ে নিজেই আপনার অভ্যাসে পরিনত হবে।

নিউপোর্টের মতে ডিপ ওয়ার্কের মূল দুই ভিত্তি হচ্ছে খুবই গভীর ভাবে একটি বিষয়ে মনোযোগ দেয়ার ক্ষমতা, ও মনোযোগ নষ্টকারী ব্যাঘাতগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার মানসিক দৃঢ়তা। এই দুইটি দক্ষতা মিলেই বলতে গেলে ডিপ ওয়ার্ক করার দক্ষতা সৃষ্টি করে।

দ্বিতীয় অংশ: ডিপ ওয়ার্ক রপ্ত করা ও কাজে লাগানো যায় কিভাবে?

০৫. ডিপ ওয়ার্কের চারটি মূল বিধিবিধান

ডিপ ওয়ার্ক কতটা মূল্যবান এবং কিভাবে কাজ করে এগুলো জানা, এবং জেনে অনুপ্রাণিত হওয়াটা খুব সহজ একটি কাজ। কিন্তু কঠিন কাজটি হচ্ছে বাস্তবে এটি করে দেখানো। কেন? – কারণ আমাদের স্বভাবই হচ্ছে বিভিন্ন দিকে মনোযোগ দেয়া। মাল্টিটাস্কিং বা বহুকর্ম আমাদের চুম্বকের মত আকর্ষণ করে।

বইয়ের দ্বিতীয় অংশে লেখক আলোচনা করেছেন কিভাবে ডিপ ওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে আমরা স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি কাজ করতে পারি। ডিপ ওয়ার্ক শেখাতে গিয়ে লেখক চারটি নিয়মের কথা বলেছেন:

#১: গভীর ভাবে কাজ করুন

#২: একঘেয়েমিকে আপন করে নিন

#৩: সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করুন

#৪: শ্যালো ওয়ার্ক বা ভোঁতা কাজকে না- বলুন

চলুন একে একে এই চারটি বিধান সম্পর্কে সংক্ষেপে বিস্তারিত জেনে নিই:

#১: গভীর ভাবে কাজ করুন:

গভীর ভাবে কাজ করাটা বেশ কষ্টকর হওয়ায় আমরা সাধারণত এভাবে কাজ করতে চাই না। এর সাথে যোগ হয় বর্তমান সময়ের কাজের পরিবেশ আর প্রতিনিয়ত চারপাশ থেকে আসা বিভিন্ন ব্যাঘাত। যার ফলে গভীর ভাবে কাজ করাটা আজকাল খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে, এবং ভোঁতা কাজ করার প্রতি আমাদের ঝোঁক দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। গভীর ভাবে কাজ করাকে যদি নিজের অভ্যাসে পরিনত করতে হয়, তবে সেজন্য আমাদের বিশেষ প্রক্রিয়া ও রুটিন তৈরী করে নিতে হবে – যাতে করে আপনাআপনিই এই অভ্যাসটির চর্চা করা যায়। সেটা কিভাবে করবেন, তা নিয়ে একটু পরে আলোচনা করব।

#২: একঘেয়েমিকে আপন করে নিন:

আগেই বলা হয়েছে, গভীর মনোযোগ এমন একটি দক্ষতা – যা অর্জন করতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। সেরা এ্যাথলেট বা খেলোয়াড়রা যেমন তাঁদের অনুশীলন সেশনের বাইরেও নিজেদের শরীরের যত্ন নেন, আপনাকেও আপনার ডিপ ওয়ার্ক সেশনের বাইরেও গভীর মনোযোগের চর্চাটি করে যেতে হবে। যদি আপনি দৈনন্দিন জীবনে সব বিষয়ে একটু একঘেয়ে লাগলেই অন্যদিকে মনোযোগ দেন, (যেমন, কাজ করতে করতে বোরিং বা একঘেয়ে লাগলে একটু ফেসবুক চেক করা, সিনেমা বা টিভি সিরিজের অংশবিশেষ দেখা, বা খেলার স্কোরটি চেক করা) – তাহলে ডিপ ওয়ার্কের জন্য প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেয়ার দক্ষতা অর্জন করা আপনার জন্য কঠিন হয়ে যাবে।

Image result for workout

তারচেয়েও ভয়ের কথা, এভাবে চলতে থাকলে আপনি আপনার মস্তিষ্ককে ঠিক উল্টো পথে প্রশিক্ষিত করে ফেলবেন। অর্থা‌ৎ মন একটু একঘেয়ে বোধ করলেই আপনি কাজ ছেড়ে অন্যদিকে মনোযোগ দেবেন। এরপর আপনি ডিপ ওয়ার্কের সময়েও কাজে পুরো মনোযোগ দিতে চাইলে আপনার মনোযোগ অন্যদিকে চলে যাবে। কারণ অন্যান্য সময়ে এটা করতে করতে আপনার মস্তিষ্ক এতেই অভ্যস্ত হয়ে যাবে।

যদি সমাধানের কথা জিজ্ঞাসা করেন, তো সমাধান একটাই: একঘেয়েমিকে আপন করে নিন। সুযোগ পেলেই ইনবক্স, সোশ্যাল মিডিয়া বা স্মার্টফোন চেক করা থেকে বিরত থাকুন। কোনও কাজের মাঝে পাঁচ-দশ মিনিটের ব্রেক পেলেও এই কাজগুলো করবেন না। এইসব মনোযোগ নষ্টকারী বিষয়ের আকর্ষণ থেকে দূরে থাকতে ব্রেনকে ট্রেইন করুন।

ধীরে ধীরে দেখবেন, কাজের মাঝেও এটা আর আপনার মনোযোগকে নষ্ট করছে না। বোরিং বা একঘেয়ে লাগলে দরকার পড়লে একটু হাঁটাহাঁটি করুন। চোখ বন্ধ করে বসে থাকুন। কিন্তু অন্যকিছুতে ব্যস্ত হবেন না – এক মিনিটের জন্যও নয়। একঘেয়েমিকে আপন করে নিয়ে কাজের মাঝে থাকুন – একটা সময়ে দেখবেন আপনি ব্যাপারটা উপভোগ করতে শুরু করেছেন।

#৩: সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করুন:

বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া হচ্ছে ‘ভোঁতা জীবন’ (Shallow Living) এর সবচেয়ে বড় উদাহরন। লেখকের মতে, যদিও এটা আমাদের জীবনে অল্প কিছু ভালো অবদান রাখে, কিন্তু এর পেছনে আমরা যতটা সময় নষ্ট করি – তা কোনওভাবেই ঠিক নয়।

যদি সব সময়ে আপনার মাথার ভেতর দুই মিনিটের জন্য সোশ্যাল প্রোফাইল চেক করার তাগাদা থাকে, তবে আপনি কখনওই গভীর ভাবে কাজ করতে পারবেন না। সত্যি বলতে, সোশ্যাল মিডিয়া একটি ভয়ানক নেশা, আর নেশা এবং ডিপ ওয়ার্ক কখনওই একসাথে চলতে পারে না। কাজেই ডিপ ওয়ার্কের সময়ে সোশ্যাল মিডিয়াকে পুরোপুরি ভুলে যান। সেইসাথে অন্য সময়েও এগুলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুন।

আগেই বলা হয়েছে, ভোঁতা কাজ বা Shallow Work হলো এমন কাজ যেগুলো করতে খুব বেশি বুদ্ধি খাটাতে হয় না, কিন্তু সেগুলো দারুন ভাবে মানুষকে আকর্ষণ করে। ফোনে কথা বলা, মেইল ও মেসেজ চেক করা ও সেগুলোর উত্তর দেয়া, মিটিং করা – এবং এই ধরনের অনেক গুরুত্বহীন ও নন-ক্রিয়েটিভ কাজ এই ঘরানায় পড়ে।

আপনি যদি সত্যিই চান যে আপনি গভীরতার সাথে কাজ করবেন, তবে এইসব ভোঁতা কাজকে দূরে সরান। জীবন থেকে এদের অস্তিত্ব মুছে দিতে হবে। অন্তত দিনের একটা সময় আপনাকে রাখতে হবে যখন এগুলোর কথা আপনি ভাবনাতেও আনবেন না। ধীরে ধীরে সেই সময়ের আকার বাড়াতে হবে, অর্থা‌ৎ, আধা ঘন্টা থেকে ১ ঘন্টা, তারপর ২ ঘন্টা – এভাবে বাড়তেই থাকবে। আপনাকে একটি রুটিনে চলে আসতে হবে, এবং সেই রুটিনের মাঝে এই ভোঁতা কাজগুলো যতটা কম থাকে ততই ভালো।

আর আপনি যখন গভীরতাপূর্ণ কাজের চর্চা করবেন – তখন যেন কোনওভাবেই কোনও ব্যাঘাত না ঘটে। ফোনকল, নোটিফিকেশন, মেসেজ – ইত্যাদি যেন আপনাকে বিরক্ত না করতে পারে।

০৬. গভীরতাপূর্ণ কাজকে অভ্যাসে পরিনত করার জন্য রুটিনের ব্যবহার করুন

এই ব্যাপারে নিউপোর্ট তাঁর বইতে লিখেছেন – “গভীরতাপূর্ণ কাজের অভ্যাস সৃষ্টি করার মূল চাবিকাঠি হলো আপনার কর্মজীবন ডিপ ওয়ার্কের উপযোগী একটি রুটিনে বেঁধে ফেলা। এর ফলে গভীর ও অখন্ড মনোযোগ সৃষ্টির জন্য সাধারণভাবে যতটা ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করা প্রয়োজন তারচেয়ে কম ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন পড়বে – অর্থা‌ৎ নিজের ওপর বেশি জোর খাটাতে হবে না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: ধরুন আপনি কোনও এক অলস বিকেলে ইন্টারনেট ব্রাউজ করতে করতে হঠা‌ৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলেন যে আপনি এখন পূর্ণ মনোযোগে একটি দারুন সৃষ্টিশীল ও বুদ্ধিদিপ্ত কাজে হাত দেবেন। এখন ওয়েব ব্রাউজিং এর মজা থেকে আপনার মনোযোগকে সত্যিকার একটি কাজের দিকে নিয়ে আসতে আপনাকে অনেক বেশি ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু এই ধরনের প্রচেষ্টা সাধারণত ব্যর্থ হয়। (এর কারণ এই নয় যে আপনার ইচ্ছাশক্তি দুর্বল, এর কারণ আপনার অভ্যাস নেই।) অন্যদিকে আপনি যদি কার্যকর একটি রুটিন সৃষ্টি করেন – এটা হতে পারে প্রতি বিকেলে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, একটি নির্দিষ্ট স্থানে আপনি ডিপ ওয়ার্ক করবেন – তাহলে এই কাজটি শুরু করা ও চালিয়ে নেয়ার জন্য আপনার নিজেকে খুব বেশি জোর করতে হবে না। ধীরে ধীরে এই অভ্যাসটি আপনি আরও বেশি সময় ধরে এবং আরও ঘন ঘন চর্চা করতে পারবেন”।

বর্তমান যুগের পরিবেশ পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত আমাদের ভোঁতা কাজ করতে উ‌ৎসাহিত করে, আর নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তি খাটানোটা মানসিক ভাবে কষ্টকর ও পরিশ্রমসাধ্য ব্যাপার – তাই এর মাঝে গভীর ভাবে কাজ করা বা ডিপ ওয়ার্ক কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এই দক্ষতাটি অর্জন করতে হলে আমাদের অবশ্যই ব্যাপারটিকে একটি রুটিনের মাঝে নিয়ে আসতে হবে। তারপর একটু একটু করে এটি অভ্যাস হয়ে যাবে।

নিউপোর্টের মতে, ৪টি পদ্ধতিতে আমরা ডিপ ওয়ার্ক করার জন্য রুটিন তৈরী করতে পারি। যেমনটা আগেই বলা হয়েছে, একবারে পুরোটা করতে গেলে নিজের ওপর অনেকটা জোর খাটাতে হবে। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে অভ্যাসটি দীর্ঘ সময়ের জন্য টিঁকে থাকবে না। তাই একটি রুটিনের মাধ্যমে অনুশীলন করলে ডিপ ওয়ার্ক আপনার স্থায়ী একটি অভ্যাসে পরিনত হবে। নিচে চারটি পদ্ধতি সংক্ষেপে বর্ণনা করছি, এর যে কোনও একটি আপনি নিজের জন্য বেছে নিতে পারেন।

Image result for meditation

#১: দরবেশ/সন্ন্যাসী পদ্ধতি:

দরবেশ বা সন্ন্যাসীরা যেমন আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য সমাজ থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে চলে যান, এই পদ্ধতিও তেমনই। দিনের বা সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আপনি সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে গভীর ভাবে নিজের কাজ করবেন।

#২: যৌগিক পদ্ধতি:

এই পদ্ধতিতে সাধারণ জীবনের সাথে সন্ন্যাস পদ্ধতি মিলিয়ে ব্যবহার করা হয়। উদাহরন হিসেবে বলা যায় প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী কাল ইয়ুঙ এর কথা। তিনি তাঁর সাধারণ চিকি‌ৎসা, গবেষণা ও সামাজিক মেলামেশার জন্য জুরিখে থাকতেন, কিন্তু তিনি তাঁর বই লেখার কাজ করতেন লোকালয় থেকে দূরে তাঁর অন্য একটি বাড়িতে। যেখানে কারও যাওয়ার অধিকার ছিলো না। ঐ বাড়িতে গেলেই তাঁর মন ডিপ ওয়ার্কের জন্য তৈরী হয়ে যেত। কারণ তাঁর রুটিনই ছিলো এ বাড়িতে গিয়ে বই লেখা। প্রথম কিছুদিন তাঁকে নিজের ওপর জোর করতে হতো, কিন্তু একটা সময়ে গিয়ে সেখানে গেলেই তিনি পূর্ণ মনোযোগে কাজ করতে পারতেন।
সিগমন্ড ফ্রয়েডের পর সেরা মনোবিজ্ঞানী ভাবা হয় কার্ল গুস্তাভ ইয়ুঙকে। মনোবিজ্ঞানের ইতিহাসের সেরা কয়েকটি বই তাঁর লেখা। কাজেই বুঝতেই পারছেন, তাঁর বই লেখার রুটিনটি আসলেই কার্যকরী ছিলো।
অনেকেই কাজের জন্য নির্দিষ্ট পরিবেশ সৃষ্টি করে নেন। অনেকে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে সেই মোমের গায়ে দাগ কাটেন। এবং বাতি পুড়ে সেই দাগের কাছে আসার আগে কাজ থেকে মনোযোগ সরান না।

#৩: ছন্দ পদ্ধতি:

এই পদ্ধতিতে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়, যেমন ভোর ৫টা থেকে সকাল ৭টা, বা সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটি দিন, যেমন শুক্রবার বা রবিবার আপনাকে ডিপ ওয়ার্ক অনুশীলনের জন্য রাখতে হবে। এবং এই ছন্দে কোনওপ্রকার ব্যাঘাত আসতে দেয়া যাবে না। এভাবে করতে পারলে একটা সময়ে চাইলেই ডিপ ওয়ার্ক করার অভ্যাস তৈরী হয়ে যাবে।

এখানে আপনার মূল উদ্দেশ্য থাকবে ডিপ ওয়ার্ক এর অনুশীলন করা। ডিপ ওয়ার্ক যখন আপনার অভ্যাস হয়ে যাবে – তখন শুধু সপ্তাহের এক দিন, বা দিনের এক ঘন্টা নয় – যে কোনও কাজ করতে চাইলেই আপনি ডিপ ওয়ার্ক পদ্ধতিতে তা করতে পারবেন।

#৪: সাংবাদিক পদ্ধতি:

সব সাংবাদিক সব সময়েই কাজে ব্যস্ত থাকেন না। কোন সময়ে তাঁদের যে এ্যাসাইনমেন্ট এসে পড়ে, তা বলা বেশ শক্ত। কিন্তু একজন দক্ষ সাংবাদিক, যখনই এ্যাসাইনমেন্ট আসে তখনই পূর্ণ মনোযোগে সেই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারেন।

লেখক নিউপোর্ট নিজেও এই পদ্ধতিতে কাজ করেন। তিনি কাজের গুরুত্বের ভিত্তিতে সেটি তাঁর দিনের পরিকল্পনায় রাখেন, এবং যখন প্রয়োজন হয় ডিপ ওয়ার্কের মাধ্যমে কাজটি করেন।


এই চারটি পদ্ধতির মধ্যে যেটি আপনার সবচেয়ে সুবিধাজনক হয়, আপনি সেটিকেই বেছে নিতে পারেন। এর যে কোনও একটির নিয়মিত অনুশীলন করলে আপনি আপনার কাঙ্খিত দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন বলে আশা করা যায়।

০৭. সবচেয়ে জরুরী বিষয়গুলোতে আগে নজর দিন

“4 Disciplines of Execution” বইয়ের উদাহরণ দিয়ে নিউপোর্ট লিখেছেন – “ ‘আপনি যত বেশি সংখ্যায় কাজ করার চেষ্টা করবেন, সত্যিকার অর্থে ততই কম কাজ আপনি শেষ করতে পারবেন’। – আপনার লক্ষ্য থাকতে হবে অল্প সংখ্যক অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এভাবে লক্ষ্যস্থির করতে পারলে তাতে অনেক বেশি মনোযোগ দেয়া যাবে, এবং সত্যিকার অর্থেই ভালো ফলাফল আসবে”। অনেক সময়ে কর্মীদের শুধু শুধু ব্যস্ত রাখার জন্য কাজ চাপিয়ে দেয়া হয় – যে কাজের আসলে কোনও গুরুত্ব নেই। কিন্তু ম্যানেজাররা বোঝেন না যে এতে করে কর্মীর কাজের আগ্রহ নষ্ট হচ্ছে। এরচেয়ে যদি তাদের অল্প সংখ্যক সত্যিকার জরুরী কাজ দেয়া হয় – তবে তারা অনেক বেশি মনোযোগ ও উ‌ৎসাহের সাথে কাজ করবে।

আপনি নিজেও যখন নিজের জন্য কাজ করবেন – তখনও এই বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করুন। যে কাজটি করতে যাচ্ছেন, তাতে আসলেই জরুরী কোনও লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে কিনা – তা ভেবে দেখুন।

এখানে একটি প্রশ্ন চলেই আসে, ‘অতি জরুরী লক্ষ্যটি আসলে কি?’ – এটা খুঁজে বের করা আপনার দায়িত্ব। খুঁজে বের করুন, কোন লক্ষটি অর্জন করা আপনার জন্য সবচেয়ে জরুরী? সেই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আপনাকে কোন কোন কাজ করতে হবে? কোন কাজের পরে কোন কাজটি আসবে? – এই প্রশ্নগুলো নিয়ে খুব গভীর ভাবে ভাবুন – তারপর সেগুলো নিয়ে কাজ শুরু করুন। একবার শুরু করার পর ব্যাঘাতের দিকে যতটা সম্ভব কম নজর দেয়ার চেষ্টা করুন। কাজের জন্য নির্দিষ্ট করা সময়ে অন্য কিছু করার চিন্তা মাথায় আসলে, জোর করে হলেও কাজ করতে থাকুন।

০৮. কৌশলগত বা পরিকল্পিত আলস্য

এই ব্যাপারে লেখক তাঁর বইয়ে লিখেছেন: “ মনোবিজ্ঞানের গবেষণা অনুযায়ী, নিয়মিত ভাবে মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়াটা ডিপ ওয়ার্ক বা গভীরতাপূর্ণ কাজের ক্ষমতাকে উন্নত করে। আপনি যখন পরিশ্রম করবেন, তখন কঠোর পরিশ্রম করবেন; যখন কাজ শেষ হবে, তখন আপনি কিছুটা সময় পূর্ণ বিশ্রাম করতে পারেন”।

কাল নিউপোর্ট এর মতে, আপনার দিনের রুটিনে যথেষ্ট পরিমান ‘পরিকল্পিত বিশ্রামের’ সুযোগ রাখুন। এই পরিকল্পিত আলস্য বা বিশ্রাম, ডিপ ওয়ার্কের জন্য জরুরী।

এই কথার পেছনে তিনি তিনটি যুক্তি দিয়েছেন:

#১. বিশ্রাম গভীর ভাবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি ফিরে পেতে সহায়তা করে:

গভীরতাপূর্ণ কাজের সময়ে যে ধরনের মনোযোগ দেয়া হয়, তার একটা সীমা আছে। সেই মনোযোগ দেয়ার শক্তি ফিরে পেতে মাঝে মাঝে শরীর-মনকে বিশ্রাম দিতে হবে।

#২. বিশ্রামের সময়ে বিশ্রাম বাদ দিয়ে আমরা যা করি, তা আসলে তেমন জরুরী কিছু নয়:

সাধারণ ভাবে, একজন মানুষের গভীরতাপূর্ণ কাজ করার ক্ষমতা দিনে দুই-চার ঘন্টার বেশি হয় না। সেই সময়টা শেষ হয়ে যাওয়ার পর আপনি যে কাজ করেন, তা খুব একটা ভালো ফলাফল দিতে পারে না, কাজেই তা তেমন একটা গুরুত্ব বহন করে না।

#৩. বিশ্রামের বা অলস সময়টাতে অবচেতন মন বেশি ভালো কাজ করে:

মনস্তাত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, কিছু কিছু জটিল সিদ্ধান্ত আমাদের অবচেতন মন চেতন মনের চেয়ে ভালোভাবে নিতে পারে। বিশ্রাম ও কর্মহীন সময় চলাকালে আমাদের অবচেতন মন বেশি ত‌ৎপর হয়ে ওঠে – এর ফলে অনেক সময়ে অনেক জটিল সমস্যার সমাধান, ও কঠিন বিষয়ে সিদ্ধান্ত চটজলদি সামনে চলে আসে। বডি বিল্ডাররা প্রচুর ব্যায়াম করেন, কিন্তু ব্যায়ম করার সময়ে কিন্তু তাঁদের শরীরের পরিবর্তন হয় না। তাঁদের পেশীর উন্নতি হয় বিশ্রামের সময়ে। বুদ্ধির কাজের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা তেমনই।
আপনি হয়তো সক্রিয় ভাবে কোনও একটি সমস্যার সমাধান নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ভাবলেন – কিন্তু সমাধান মাথায় আসলো না। তারপর একটা ঘুম দিয়ে ওঠার পর দেখলেন সমস্যার সমাধানটি মাথায় চলে এসেছে। ঠিক যেমন ভারী ব্যায়াম করে পরের দিন সকালে উঠে দেখা যায় পেশীগুলো সুন্দর হয়ে উঠেছে।

একটি ব্যাপার মনে রাখবেন, অলস সময় বা বিশ্রাম বলতে এখানে লেখক ভোঁতা কাজে ফিরে যাওয়াকে বোঝাননি। এই সময়টা ফেসবুক – ইত্যাদিতে মনোযোগ না দিয়ে অল্প করে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারেন, একটু হাঁটাহাঁটি করতে পারেন, বাস্তব জীবনে, অর্থা‌ৎ সামনা সামনি কোনও বন্ধু বা আপনজনের সাথে গল্প করতে পারেন, সন্তানদের সাথে সময় কাটাতে পারেন, চোখ বুঁজে প্রিয় গান শুনতে পারেন, একটু শরীরচর্চা করতে পারেন। এতে করে সবদিক দিয়েই আপনার ভালো হবে।

এটা করার জন্য কাল নিউপোর্ট তাঁর বইয়ে একটি উপায়ের কথা বলেছেন, যার নাম তিনি দিয়েছেন: “Shutdown Ritual” – মানে সবকিছু বন্ধ করে দেয়ার অভ্যাস। আপনার দিনের কাজ শেষ হয়ে গেলে মাথা থেকে সব কাজের চিন্তা দূর করে দিন। রাতের খাওয়ার পর কোনও ই-মেইল চেক করতে যাবেন না, সারাদিনে কার সাথে কি কথা হলো – সেগুলো নিয়ে চিন্তা করবেন না, এবং কালকের দিনের চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে পরিকল্পনাও করবেন না। তার মানে এই না যে এগুলো একদমই করবেন না। এগুলো করার জন্য আলাদা সময় রাখুন। কাজগুলো Shutdown Ritual শুরুর আগেই সেরে ফেলুন। তারপর কাজ নিয়ে চিন্তা করাই বন্ধ করে দিন।

নিউপোর্ট তাঁর দিনের কাজ সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটার মধ্যে শেষ করে ফেলেন, এবং তিনি বলতে গেলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কোনও কাজই করেন না। কিন্তু এতটা অল্প সময় কাজ করেও তিনি এরমধ্যেই বেশ কয়েকটি বেস্ট সেলিং বই লিখে ফেলেছেন, প্রতি বছর তিনি একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন – সেইসাথে আরও অনেক কিছুই করেন। বহু মানুষ তাঁর চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ পরিশ্রম করেও এতটা সাফল্য পান না।

আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, কাজের সাফল্য কতটা বেশি সময় ধরে কাজ করা হলো- তার ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে আপনি যতক্ষণ কাজ করছেন সেই সময়ের পূর্ণ সদ্ব্যবহারের ওপর।

০৯. রুজভেল্ট পদ্ধতিতে কম সময়ে বেশি কাজ শেষ করুন

একটা কথা হয়তো আপনিও অনেকবার শুনেছেন: Hard Work এর চেয়ে Smart Work এর মাধ্যমে বেশি সাফল্য পাওয়া যায়।

নিউপোর্ট তাঁর বইয়ে লিখেছেন: “রুজভেল্ট (সাবেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট) পদ্ধতিতে কাজ করতে হলে আপনাকে মাঝে মধ্যে রুজভেল্ট এর মত প্রবল ভাবে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। নির্দিষ্ট করে বললে, আপনার দিনের কাজের মাঝে এমন একটি কাজ খুঁজে বের করুন যার জন্য আপনার গভীর ভাবে কাজ করার প্রয়োজন পড়বে, এবং যা করাটা আপনার জন্য বেশ জরুরী। এখন ভেবে বের করুন সেটা করতে সাধারণ ভাবে আপনার কতটা সময় প্রয়োজন। এরপর সেই সময়ের থেকে অনেকটা কমিয়ে একটি কঠোর ডেডলাইন ঠিক করুন। আপনার ফোনে, কম্পিউটারে, বা ঘড়িতে একটি টাইমার সেট করুন। টাইমারটি এমন জায়গায় রাখুন যেন কাজের সময়ে তা কখনওই চোখের আড়াল না হয়”।

Image result for roosevelt dashes

ওপরে বর্ণিত রুজভেল্ট পদ্ধতি আসলে আমেরিকার ২৬তম প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এর পড়াশুনা করার পদ্ধতি থেকে নেয়া। এটি কর্মক্ষেত্রে ডিপ ওয়ার্কের সংমিশ্রণ ঘটানোর একটি সহজ পদ্ধতি। এই পদ্ধতি মেনে কাজ করলে আপনার অন্যদিকে মনোযোগ দেয়ার কোনও সুযোগই থাকে না। কারণ, ডেডলাইন গুলো হয় বেশ ছোট এবং এই কারণে আপনার মনোযোগও থাকে অনেক বেশি। এভাবে কাজ করতে থাকলে অন্য কিছুর প্রতি মনোযোগ দেয়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে চলে যাবে। এবং আপনি একটা সময়ে দারুন মনোযোগ দেয়ার দক্ষতা অর্জন করবেন।

১০. গভীরতাপূর্ণ জীবন (উপসংহার)

বইয়ের শেষ দিকে লেখক লিখেছেন: “সত্যি বলতে, গভীরতাপূর্ণ জীবন সবার জন্য নয়। কারণ এটি অর্জন করতে কঠোর পরিশ্রম ও অভ্যাসের দারুন পরিবর্তন করতে হয়। অনেকের ক্ষেত্রেই প্রচুর পরিমান ই-মেইল করা, এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে নিয়মিত কাজ করাটা দারুন প্রশান্তির বিষয়। কিন্তু গভীরতাপূর্ণ জীবনে প্রবেশ করতে হলে এসবকে ছেড়ে আসতে হয়। সেই সাথে সেরা কাজটি করার চেষ্টারত অবস্থায় একটি অস্বস্তি প্রায়ই মানুষের মনকে বিরক্ত করে। মানুষের মনে হয়, সে অনেক চেষ্টা করেও নিজের সেরা কাজটি করতে পারছে না – এবং এই সত্যিটা উপলব্ধি করতে অনেকেই ভয় পায়। চর্চার মাধ্যমে নিজের সেরা কাজটি বের করে আনাটা সময়ের ব্যাপার”।

সত্যি কথা বলতে গভীর ভাবে কাজ করা ও গভীরতাপূর্ণ জীবন অর্জন করা মাঝে মাঝে খুবই যন্ত্রণাদায়ক বিষয়।

আপনাকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ব্যাঘাত আর মানসিক বাধার সাথে লড়াই করতে হবে, নিজেকে প্রতিনিয়ত মনোযোগ ধরে রাখার জন্য জোর করতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় দেয়াকে বেশ খানিকটা কমিয়ে আনতে হবে, ইন্টারনেটে কম সময় কাটাতে হবে, দিনের শুরুতেই পুরো দিনের পরিকল্পনা করতে হবে (বিশ্রামের সময় সহ) – ইত্যাদি ইত্যাদি।

গভীরতাপূর্ণ জীবন তাই সবার জন্য নয়। বেশিরভাগ মানুষের জন্য এটা অনেক বেশি পরিশ্রম ও অস্বস্তির। এর চেয়ে ‘নকল ব্যস্ততা’ ও ব্যাঘাত ঘটানো বিষয়ের প্রতি ঝুঁকে পড়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটানো, ভোঁতা কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখা, মন চাইলেই অন্যদিকে মনোযোগ দিতে পারাটা অনেক বেশি প্রশান্তির।

কিন্তু, আপনি যদি আপনার দক্ষতা বাড়ানো, নিজের মেধার সেরা ব্যবহার, নিজের মনের পূর্ণ ক্ষমতাকে কাজে লাগানো, এবং বড় সাফল্য পাওয়ার ব্যাপারে সত্যিই সিরিয়াস হন – তবে ডিপ ওয়ার্ক পূর্ণ জীবনই আপনাকে বেছে নিতে হবে। আর সেই জীবন বেছে নেয়ার জন্য কার্ল নিউপোর্টের ডিপ ওয়ার্ক বইটি হতে পারে আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো দিক নির্দেশনা।


লেখাটি কেমন লাগলো, তা আমাদের কমেন্ট করে জানান। আপনার সব ধরনের মতামতই আমাদের জন্য অমূল্য পাথেয়।

যদি মনে করেন লেখাটি সত্যিই কারও কাজে লাগবে, তাহলে শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন। সাফল্যের পথে লড়াকু সব সময়ে আপনার সাথে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *