দ্রুত কাজ করার উপায়: ১২ মাসের কাজ মাত্র ১২ সপ্তাহে শেষ করুন – (বুক রিভিউ)


  • By
  • July 5th, 2018
  •    
  • পড়তে সময় লাগবে: 6 minutes
  • 2,628 views

আপনাকে যদি বলা হয় যে এমন একটি উপায় আছে, যার মাধ্যমে আপনি এক বছরের কাজ ১২ সপ্তাহে করতে পারবেন- তাহলে কেমন হত? নিশ্চই আপনার হাতে যে পরিমান সময় আছে, সেই সময়ে আপনি স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত – অন্তত ৪গুন বেশি কাজ করতে পারতেন।!

দ্রুত কাজ করার উপায়: “12 week year”

যদি বলা হয় আপনার ১০,০০০ টাকার মাসিক আয় একটু চেষ্টা করলেই খুব দ্রুত ৪০,০০০ টাকায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব? – কি, রূপকথা মনে হচ্ছে? এটা কিন্তু আসলেই সম্ভব! সম্ভব বলছি এই কারণে যে অনেকেই এটা করে দেখাতে পেরেছেন।

অনেকে নিজের চেষ্টাতেই পেরেছেন, আবার অনেকে দারুন এক উপায় বা মেথড এর সন্ধান পাওয়ার পরে পেরেছেন। দ্রুত কাজ করার এই উপায় এর আবিষ্কারক দুইজন অসাধারন প্রতিভাধর মানুষ, যাঁরা বিশ্বের বড় বড় কোম্পানীতে প্রোডাক্টিভিটির প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।

ব্রায়ান মোরান এবং মাইকেল লেনিংটনের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম আর গবেষণার ফল এই পদ্ধতি, যেটিকে তাঁরা মলাটবন্দী করেছেন “The 12 week year: get more done in 12 weeks than others do in 12 months” বইয়ে।

যদিও বইটির টাইটেল পড়ে অনেকেরই মনে হতে পারে উপায়টি খুবই জটিল, কিন্তু আসলে এটি খুবই সহজ একটি উপায়। আপনার মাঝে যে গুনগুলো আছে, সেই গুনগুলিকেই একটু ভালভাবে ও পরিকল্পিত উপায়ে কাজে লাগালেই বর্তমানে যা অর্জন করছেন, তারচেয়ে অন্তত ৪ গুন বেশি আউটপুট পাওয়া সম্ভব। এই বইয়ে লেখকেরা টমাস আলভা এডিসনের একটি উক্তি দিয়েছেন:

“আমাদের সত্যিকার কাজ করার ক্ষমতা যদি পুরোটা কাজে লাগাতে পারি – তবে আমরা নিজেদেরই অবাক করে দেব।“

দ্রুত কাজ করার উপায় বিষয়ক বইটির বিষয়বস্তু আসলে এই কথাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। প্রথম অধ্যায়ে লেখকেরা স্টিভেন প্রেসফিল্ড এর একটি উক্তি উল্লেখ করেছেন: “বেশিরভাগ মানুষের দুটি জীবন আছে, এক- যে জীবন সে এই মূহুর্তে যাপন করছে, দুই- যে জীবন যাপন করার ক্ষমতা সে রাখে।“

– অর্থা‌ৎ বেশিরভাগ মানুষই জীবনে যা পায়, তারচেয়ে অনেক বেশি পাওয়ার ক্ষমতা তার আছে। কিন্তু নিজের এই ক্ষমতা সম্পর্কে বেশিরভাগ মানুষই আসলে উদাসীন। আবার নিজের এই ক্ষমতা সম্পর্কে জানলেও অনেকেই সঠিক উপায় খুঁজে পায় না। ব্রায়ান ও মাইকেল এই দুই ধরনের মানুষের উপকারের জন্যই বইটি লিখেছেন।

বইটিতে জোর দেয়া হয়েছে লক্ষ্য নির্ধারণ এবং স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ গুণ দ্রুত সেই লক্ষ্যে কিভাবে পৌঁছানো যায় – তার ওপর। চিন্তা করে দেখুন আপনি যদি জীবনের গতি চার গুন দ্রুত করে নিতে পারেন, তবে আপনার অর্জনের খাতা কোথায় গিয়ে ঠেকবে!

এই বইয়ে এমন একটি ছক বেঁধে দেয়া আছে, যার মাধ্যমে আপনি এই মূহুর্তে যে কাজ করা সবচেয়ে জরুরী, তার ওপর মনযোগ দিতে পারবেন এবং সেই কাজ সূচারু ভাবে দ্রুত শেষ করতে পারবেন। লেখকদ্বয় মূলত জোর দিয়েছেন স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা বা Short Term Planning এর ওপর।

বইতে তাঁরা লিখেছেন: “আপনি যত লম্বা সময়ের জন্য পরিকল্পনা করবেন, তা ততই বেশি অনিশ্চিত হবে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ক্ষেত্রে একটি ধারনার ওপর আরেকটি ধারনা চড়ে বসে, এবং তার ওপর আরও আগের কোনও ধারনা চড়ে বসে। আগামী ১২ মাস বা ২৪ মাস আপনার প্রতিদিনের কাজ কি হবে তা নির্ধারণ করা অসম্ভব না হলেও, খুব সহজও নয়।“

এই লেখায় আমরা বইয়ের মূল ৭টি লিসন নিয়ে কথা বলব। যেগুলো ব্যবহার করে আপনি এমন পরিকল্পনা করতে পারবেন, যেগুলো অনেক বেশি দ্রুত ফলাফল এনে দেবে। চলুন তাহলে জেনে নিই দ্রুত কাজ করার উপায় গুলো:

০১. দ্রুত ও সেরা কাজ করার জন্য জরুরী আটটি উপাদান রপ্ত করা

Image result for batman super man

লেখকদ্বয় তাঁদের বইয়ে লিখেছেন, কোনও কাজ বা পরিকল্পনায় দ্রুত সেরা পারফর্মেন্স পাওয়ার জন্য ব্যক্তি বা টিমের মাঝে নিচের আটটি বিষয় বা উপাদান থাকা খুবই জরুরী:

i) ভিশন: কোনও লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সেই ভবিষ্যতের একটি স্পষ্ট ছবি টিমের সবার মনে গাঁথা থাকতে হবে।

ii) পরিকল্পনা: একটি কার্যকর পরিকল্পনা থাকলে ভিশন বাস্তবায়নের ধাপগুলোর ওপর সবারই ফোকাস থাকে।

iii) দৈনিক পরিকল্পিত কাজ: আপনার মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রতিদিন কিভাবে কাজ করবেন সেটা ঠিক করা থাকতে হবে। প্রতিটি দিনের কাজ ও কাজের পদ্ধতি ভাগ করা থাকতে হবে। এতে করে কাজ সরল গতিতে এগিয়ে যাবে।

iv) হিসাব: কাজ কিভাবে হচ্ছে, কেমন হচ্ছে, এবং কতটা এগুচ্ছে, তার নিয়মিত হিসাব রাখতে হবে। এটা আপনাকে প্রতিদিনকার সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে সাহায্য করবে।

v) নির্দিষ্ট কাজে নির্দিষ্ট সময়: প্রতিটি মূহুর্তের জন্য কাজ নির্দিষ্ট করে রাখুন; অন্য কথায়, প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখতে হবে – এতে করে অগোছালো কাজ করার সম্ভাবনা থাকবে না।

vi) দায়িত্ববোধ: কোনও কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ না থাকলে সেই কাজ কখনওই সেরা সাফল্য পাবে না। দায়িত্ববোধ হল একটি কাজ বা পরিকল্পনাকে ‘নিজের মনে করা।‘ কোনও কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকলে, পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, আপনি যে কোনও মূল্যে কাজটি সফল ভাবে শেষ করতে চাইবেন।

vii) প্রতিজ্ঞা: সম্মান ও সাফল্যের সাথে কাজ করার জন্য প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাটা জরুরী। অন্যকে বা নিজেকে কোনও প্রতিশ্রুতি দিলে সেই প্রতিশ্রুতি কখনওই ভাঙা যাবে না। আপনার চরিত্রে যদি এই গুনটি থাকে – তবে সব কাজ সময়মত বা তারচেয়েও দ্রুত শেষ করতে পারবেন।

viii) বর্তমান মূহুর্তকে বড় করে দেখা: আপনি হয়তো ভবিষ্যতে অনেক বড় কিছু অর্জন করার জন্য কাজের পরিকল্পনা করেছেন, এবং কাজ করছেন। কিন্তু সেই বড় কিছু অর্জনের আগের প্রতিটি মূহুর্তকেও আপনার বড় করে দেখতে হবে।

এই প্রতিটি উপাদানই একজন কর্মীকে তার কাজে সেরা পারফর্মেন্স দেয়ার জন্য অনুপ্রানীত করে। আপনি যে কাজেই নামুন না কেন, এই গুনগুলো আপনার মাঝে নিয়ে আসাটা খুবই জরুরী। এর ফলে অনেক বেশি দ্রুত কাজ করতে পারবেন।

০২. ভবিষ্যতের এমন একটি ছবি মনের মাঝে রাখুন, যা আপনাকে প্রতি মূহুর্তে অনুপ্রাণিত করবে

vision of the future

লেখকেরা বইয়ে লিখেছেন –“জীবনের সেরা অর্জনটি করতে হলে আপনাকে নিজের আরাম আয়েশের চেয়ে সেই অর্জনটিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।“

সত্যিকারের অর্জনের পথে অনেক সময়েই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে। এই সময়ে ভবিষ্যতের ছবিটি যেন আপনাকে হাল ধরে রেখে এগিয়ে যাওয়ার উ‌ৎসাহ দেয়। ছবিটি সামনে ভেসে উঠলে যেন সমস্ত আলস্য দূর করে দিতে ইচ্ছে হয়, সব বিপদ তুচ্ছ মনে হয়।

এই মনছবির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে লেখকেরা লিখেছেন: “সঠিক পথে থাকার জন্য আপনার একটি শক্তিশালী কারণের প্রয়োজন হবে, কারণটি সেই ভিশন বা মনছবি।“

ভেবে দেখুন, সৈনিকেরা যখন নিজের দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধ করে, দিনের পর দিন অমানবিক কষ্টের মাঝ দিয়ে যায়, খেয়ে না খেয়ে বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়ে থাকে – তাদের মনে কি কাজ করে? –

তাদের মনে একটাই ছবি থাকে, যুদ্ধ শেষে শান্তি আর সমৃদ্ধি। নিজের সন্তানের স্বাধীন দেশের মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেয়ার মনছবি। আপনাকেও নিজের মনে এমন একটি ছবি সৃষ্টি করে নিতে হবে। আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে, এত কষ্টের পর যখন সাফল্য আসবে, তখন এই কষ্ট করার জন্য আপনার গর্ব হবে।

বইয়ের লেখকেরা পাঠকদের দুইটি ভিশন লিখতে বলেছেন। প্রথমটি আপনার পূর্ণ জীবনের লক্ষ্য নিয়ে, দ্বিতীয়টি সামনের ৩ বছর নিয়ে।

পূর্ণ জীবনের ভিশনটি হতে পারে আপনি জীবনে নিজেকে কোথায় দেখতে চান, এবং কি অর্জন করতে চান তার একটি কাল্পনিক মনছবি। এটা হতে পারে অনেক টাকার মালিক হওয়া, সন্তানদের বড় মানুষ হতে দেখে যাওয়া, একজন স‌ৎ ও ধর্মপরায়ণ মানুষ হওয়া, অথবা দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় নীতি নির্ধারক হওয়া।

আর ৩ বছর মেয়াদী ভিশনটি হবে আগামী তিন বছরে কি কি অর্জন করতে চান – তা নিয়ে। সেটা হতে পারে ব্যবসায়ের মুনাফা দুই গুণ করা, চাকরিতে প্রমোশন পাওয়া, কোনও প্রতিযোগীতায় জেতা, বই প্রকাশ করা – ইত্যাদি।

এক্ষেত্রে মোরান ও লেনিংটন ভাবনার শক্তিকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন। একই ভাবনা সব সময়ে ভাবতে থাকলে, সেটা একসময়ে বিশ্বাসে পরিনত হয় এবং উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস দারুন ভাবে বেড়ে যায়। তাঁরা লিখেছেন:

“একটি উ‌ৎসাহপূর্ণ ভবিষ্যতের ভাবনার মাধ্যমে আপনার মস্তিষ্ককে শক্তিশালী ও উন্নত করতে পারেন। আপনি যে জীবন আশা করেন, সেই জীবন নিয়ে এমন একটি মনছবি তৈরী করুন – যা আপনার আবেগকে নাড়া দেয়, এবং তা নিয়ে নিয়মিত ভাবুন।“

যে ভিশন আপনি লিখেছেন, সেটাকে দিনের শুরুতে ও শেষে একবার করে পড়ুন। প্রতি সপ্তাহের পরিকল্পনা করার সময়ে পড়ুন। সেই সাথে যখনই মনে হবে এই মূহুর্তে আপনার অনুপ্রেরণা প্রয়োজন, তখনই ভিশনগুলিতে চোখ বুলান।

০৩. ১২ সপ্তাহের লক্ষ্য ঠিক করুন

set goal and achieve, দ্রুত কাজ কিভাবে করা যায়

জগতের নিয়মই হলো, কোনওকিছু দীর্ঘ সময় একরকম থাকে না। প্রতি মূহুর্তে পরিস্থিতি বদলায়। আর এটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় ঝুঁকির দিক।

একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সেট করার অল্প পরেই হয়তো আপনার মনে হবে এটা আসলে সেরা পরিকল্পনা ছিল না, অথবা নতুন কোনও ভাল সুযোগ সামনে এসে পড়তে পারে যা নিতে গেলে মূল পরিকল্পনায় অনেকটা বদল আনতে হবে। এই পরিকল্পনাটি যদি অনেক বড় হয়, তখন তাতে দ্রুত বদল আনাটাও কঠিন হয়ে যাবে।

কিন্তু, বর্তমান পরিকল্পনাটি যদি সেরা পরিকল্পনা না হয়, তবে কি সেটা নিয়ে কাজ করে যাওয়াটা উচি‌ৎ?

লেখকেরা এখানে পিটার ড্রুকারের উক্তি টেনে লিখেছেন:

“যা করার কোনও দরকারই নেই, তার পেছনে খুব বেশি মেধা ও শ্রম ব্যায় করা আসলে অপচয়।“

এখানে আপনাকে লক্ষ্য থেকে সরে আসতে বলা হচ্ছে না। লক্ষ্য তার জায়গায়ই থাকবে – কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য সেরা পরিকল্পনা নিয়ে এগুনোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। আর সেক্ষেত্রে যদি অনেক বড় দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে বসে থাকেন, তবে তা পরিবর্তন করাটাও দারুন ঝামেলার কাজ হয়ে বসতে পারে। তাই বড় লক্ষ্যটিকে ছোট ছোট পরিকল্পনায় ভাগ করুন, যেন প্রয়োজনে তা দ্রুত বদলানো যায়।

১২ সপ্তাহের লক্ষ্য অনেক দূরের ভবিষ্য‌ৎ চিন্তা করে করা হয় না।

১০ বছর পরের পরিস্থিতির চেয়ে ১২ সপ্তাহ পরের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারনা করাটা অনেক বেশি সহজ। সেই সাথে ১২ সপ্তাহের পরিকল্পনায় আপনি প্রতিদিন এবং প্রতি সপ্তাহে কি কি কাজ করবেন, সেটা ঠিক করাও অনেক সহজ।

১২ সপ্তাহ শেষ হয়ে গেলে, পরিস্থিতির কতটা পরিবর্তন হয়েছে, নতুন কোনও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে কি-না, মূল পরিকল্পনায় কোনও পরিবর্তন দরকার কি-না- ইত্যাদি বোঝার চেষ্টা করুন। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন এনে পরের ১২ সপ্তাহের জন্য একটি পরিকল্পনা করে কাজে নেমে পড়ুন।

১২ সপ্তাহে ১২ মাসের কাজ করা মানে তিন মাসে ১ বছরের কাজ করা। অর্থা‌ৎ স্বাভাবিকের চেয়ে ৪গুন দ্রুত কাজ করা। ভেবে দেখুন, যদি সত্যিই এই উপায় ব্যবহার করে কাজ করতে পারেন, তবে আপনি নিজেকে কোন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবেন?

০৪. লক্ষ্যগুলোকে কর্ম পরিকল্পনায় (Action Plans) ভাগ করুন

প্রতিটি ১২ সপ্তাহ আসলে আপনার মূল লক্ষ্য এবং মূল কর্ম পরিকল্পনার মাঝে একটি সেতুবন্ধন। ১২ সপ্তাহের পরিকল্পনার মাধ্যমে কোন কাজ কখন করবেন – তার একটি স্পষ্ট ধারনা পাবেন। এই বারো সপ্তাহকে এক একটি দিনে ভাগ করে প্রতিদিনের কাজগুলো নির্দিষ্ট করে নিন। এতে কাজ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত এগুবে।

লেখকদ্বয়ের ভাষায়, আপনার লক্ষ্য পূরণের জন্য সবচেয়ে জরুরী কাজগুলোকে আলাদা করে নিয়ে সবার আগে সেগুলো করা গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনের কাজই ঠিক করবে আপনার ভবিষ্য‌ৎ কেমন হবে।

action plan image

তাঁরা আরও লিখেছেন: “ভবিষ্যতে কি আছে তা যদি জানতে চান, তবে আজকের কাজের দিকে তাকান; এগুলোই ভবিষ্য‌ৎ সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ধারণা দেবে”

এছাড়া, সাপ্তাহিক ও দৈনিক পরিকল্পনা করলে জরুরী কাজগুলোর পাশাপাশি, অদরকারী কাজ চিহ্নিত করতে –সুবিধা হবে।

এই প্রসঙ্গে তাঁরা লিখেছেন: “যা করলে সত্যিকারেই লাভ হবে, তারচেয়ে বেশি সুযোগ সব সময়েই আপনার সামনে থাকবে।“

অর্থা‌ৎ সুযোগ আসলেই তা গ্রহণ করা সব সময়ে লাভজনক নয়। আপনার যদি একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ঠিক করা থাকে, তবে নতুন সুযোগ গুলোর সাথে এগুলোর তুলনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। পরিকল্পনা ঠিক না করা থাকলে, সব সুযোগই ভাল বলে মনে হবে – আপনি সবগুলো সুযোগকেই বাজিয়ে দেখতে চাইবেন – যার ফলে অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে যাবে।

প্রতিটি লক্ষ্য পূরণের জন্য যেসব কাজ করা জরুরী সেগুলো অবশ্যই আগে থেকে খুঁজে বের করে লিখে রাখতে হবে। প্রতিটি কাজের জন্য সময় বেঁধে দিতে হবে। এরপর নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে “এই কাজগুলো করতে কি ধরনের বাধা আমার সামনে আসতে পারে?”

এরপর প্রশ্ন করতে হবে: ”এই বাধাগুলো দূর করতে আমাকে কি কি করতে হবে?”

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরে যেসব সমস্যা ও সম্ভাবনা আসবে, সেগুলো বিবেচনা করে আপনাকে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। হয়তো সব সময়ে এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবের সাথে মিলবে না – কিন্তু এভাবে কাজ করলে সমস্যা সমাধানে অনেক সুবিধা হবে। প্রতিটি সমস্যার ক্ষেত্রেই অন্ধকারে হাতড়াতে হবে না। ফলে, আপনার ধারনার চেয়েও দ্রুত গতিতে কাজ করে যেতে পারবেন।

০৫. নিয়মিত ভাবে কাজ রিভিউ করুন

আমাদের জীবন বাধা বিঘ্নে ভরা। এক মনে কাজ করাটা আজ অন্য যে কোনও যুগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন চাইলেই যে কেউ কারণে অকারণে আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। আপনি হয়তো কোনও জরুরী কাজে আছেন, মোবাইল ফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে একটু খোশ গল্প করে কোনও বন্ধু বা আত্মীয় চাইলেই আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে পারে। এছাড়াও কোনও বিশেষ দিনের কারণে কাজের সময় নষ্ট হতে পারে। কাজেই চাইলেও অনেক সময়ে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করার উপায় থাকবে না।

এই কারণে মাঝে মাঝেই কাজের অগ্রগতি ও অবস্থা পর্যালোচনা করা এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনায় একটু পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতে পারে।

review

এমন পরিস্থিতির সামনে না পড়লেও নিয়মিত ভাবে কাজের পর্যালোচনার জন্য সময় দিন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বর্তমান অবস্থা নিবিড় ভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। এই প্রসঙ্গে লেখকেরা পরামর্শ দিতে দিয়ে লিখেছেন: “প্রতি সপ্তাহের শুরুতে ১৫-২০ মিনিট সময় নিয়ে আগের সপ্তাহের কাজের অবস্থা পর্যালোচনা করুন এবং সামনের সপ্তাহের ব্যাপারে পরিকল্পনা করুন।“

সাপ্তাহিক রিভিউ বা পর্যালোচনার জন্য নিচের ৪টি বিষয় বিবেচনা করতে পারেন:

  • ১২ সপ্তাহের লক্ষ্য পূরণে আজ পর্যন্ত কতটা এগিয়েছেন, সেটা ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। যতটুকু এগুনো দরকার ততটা এগিয়েছেন কিনা, অথবা তারচেয়ে বেশি বা কম কাজ করেছেন কিনা – তা বের করুন।
  • আজ পর্যন্ত যতটা কাজ হয়েছে, তা কি কোনওরকম সাফল্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে?
  • পরের সপ্তাহে কি কি করবেন, তা আবার রিভিউ করুন।
  • মূল লক্ষ্য বা মনছবি ঠিকমত মনে গাঁথা আছে কিনা- তা পর্যালোচনা করুন। প্রয়োজনে আবার তাতে চোখ বুলান।

০৬. সফল ভাবে প্রতিজ্ঞা পূরণের ৪ সূত্র

আগেও আমরা একটি শক্তিশালী প্রতিজ্ঞার ক্ষমতা সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করেছি। লক্ষ্যের প্রতি এমন একটি প্রতিজ্ঞা বা ওয়াদা থাকতে হবে- যা আপনি নিজের জীবনের অংশ করে নেবেন। সেই প্রতিজ্ঞা মূল বড় লক্ষ্যের প্রতি তো থাকবেই, ১২ সপ্তাহ, এক সপ্তাহ, এবং প্রতিটি দিনের প্রতিও এই প্রতিজ্ঞা থাকতে হবে। এই প্রতিজ্ঞা, প্রতিশ্রুতি, বা ওয়াদা – যেটাই বলুন, আপনার কাজে অভাবনীয় দ্রুত গতি এনে দেয়ার উপায় হিসেবে কাজ করবে।

keep your promise no matter what এর ছবির ফলাফল

মোরান এবং লেনিংটন তাঁদের বইয়ে সফলভাবে এই প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য ৪টি সূত্র দিয়েছেন:

  • শক্তিশালী আকাঙ্খা: লক্ষ্যের প্রতি আপনার একটি ভিশন বা মনছবি রয়েছে। এই মনছবিকে বাস্তব করার জন্যই আপনার সমস্ত চেষ্টা। মনছবি বাস্তব করার জন্য আমরা তখনই সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করি, যখন তা একটি শক্তিশালী আকাঙ্খায় রূপ নেয়।ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি: মনে করুন আপনি দুই ঘন্টা আগে দুপুরের ভাত খেয়ে উঠেছেন। এখন আপনার অল্প অল্প ক্ষুধা লেগেছে, এবং মনে হচ্ছে, একটা পিজা খেতে পারলে হত। আপনি পিজা খাওয়ার লক্ষ্যে বেরিয়ে পড়লেন, কিন্তু বেরিয়ে দেখলেন আশাপাশে সব পিজার দোকান বন্ধ। আপনার একটু মন খারাপ হল – এবং আপনি বাড়ি ফিরে আসলেন। এটা একটি সাধারন লক্ষ্যের উদাহরন।এবার ধরুন, আপনার সন্তানের জ্বর। ভাত খেতে পারছে না। তাকে জিজ্ঞাসা করলেন সে কি খেতে চায়। সে জানালো পিজা খেতে চায়। আপনি বের হলেন পিজার খোঁজে। বের হয়ে দেখলেন আশপাশের সব পিজার দোকান বন্ধ। আপনার মনে পড়লো সন্তানের মায়াভরা মুখ। এখন কি করবেন? আপনি ইন্টারনেট ঘেঁটে বের করলেন আর কোথায় পিজা পাওয়া যায়। তারপর ছুটে গেলেন পাশের এলাকায় বা আরও দূরে কোথাও। পিজা নিয়ে তবেই বাড়ি ফিরলেন।তীব্র একটা আকাঙ্খা জড়িয়ে থাকা লক্ষ্যের উদাহরন। এই শক্তিশালী আর তীব্র আকাঙ্খাই আমাদের অসম্ভবকে সম্ভব করার শক্তি যোগায়। এই আকাঙ্খার বলেই আমরা প্রতিজ্ঞা পূরণ করি। আপনার লক্ষটিকেও এমন একটি আকাঙ্খায় পরিনত করতে হবে। মনে রাখবেন, আমরা যা চাই – তাই পাই না; আমরা শুধু সেটাই পাই, যেটা আমাদের ‘পেতেই হবে’।
  • মূল কাজ ঠিক করুন: পরিকল্পনা যখন ভাগ করবেন, তখন প্রতিটি ভাগের জন্য একটি মূল কাজ ঠিক করে রাখুন। তাহলে প্রতি সেশন কিভাবে শুরু করবেন – তা নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করতে হবে না।
    যেমন ধরুন আপনি ঠিক করেছেন, এই সপ্তাহে ২০০ জন কাস্টোমারকে আলাদা আলাদা ইমেইল পাঠাবেন। এখন এই ২০০ জনের মাঝে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় কাস্টোমার আছেন ৩০ জন। এভাবে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ২০০ জন কাস্টোমার বা ক্রেতাকে ভাগ করে ক্যাটাগরি অনুযায়ী মেইল পাঠাতে থাকুন। আপনার মূল কাজটি হবে প্রথম ত্রিশজন ক্রেতাকে মেইল করা – তাহলে মূল কাজটি আগে করা হয়ে যাবে। এরপর বাকি কাজ করতে চাপ যেমন কম হবে, তেমনি সময়ও কম লাগবে।
  • খরচের হিসাব রাখুন: এখানে খরচ বলতে শুধু টাকা বোঝানো হচ্ছে না। একটি কাজের পেছনে টাকা যেমন খরচ হয়, তেমনি সময়, শ্রম – ইত্যাদিও খরচ হয়। প্রতিটি পরিকল্পনা করার সময়ে খেয়াল রাখুন সেগুলো বাস্তবায়ন করতে আপনার লাভ না ক্ষতি হচ্ছে। ক্ষতি হলে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনুন। ক্ষতির পরিমান বেশি হয়ে গেলে কাজের প্রতি মনযোগ থাকে না।
  • আবেগ নয়, প্রতিশ্রুতির কারণে কাজ করুন: আবেগের কাছে নতিস্বীকার করলে আপনি সময়ের কাজ সময়ে শেষ করতে পারবেন না। কাজেই ‘মন চাইছে না’ বা ‘ইচ্ছে করছে না’ – এই অজুহাতে কাজ ফেলে রাখবেন না। একবার প্রতিজ্ঞা করলে সেই কাজ সময়মত শেষ করুন, আবেগ অনুভূতিকে প্রশ্রয় দেবেন না তাহলে এগুলো সব সময়েই জ্বালাতন করবে।

আমাদের লক্ষ্যগুলো আসলে নিজের কাছে করা এক একটি ওয়াদা বা প্রতিজ্ঞা। বিষয়টিকে যদি এভাবে দেখতে না পারেন, তবে আপনার ছোট বড় – সব পরিকল্পনা আর লক্ষ্যই অপূর্ণ থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যায়। কাজেই প্রতিজ্ঞার সামনে কোনও বাধাকে বাধা মনে করবেন না। যদি এই উপায় অবলম্বন করেন, দেখবেন পরিকল্পনাগুলো সুন্দর ভাবে কাজ করছে।

০৭. কাজের সময়ে শুধুই কাজ করুন

ধরুন আপনি খুব চম‌ৎকার একটি পরিকল্পনা করেছেন। আপনি জানেন যে সামনের বারো সপ্তাহের প্রতিটি দিন কি করবেন। দিনের পুরোটাই যে কাজে ব্যস্ত থাকবেন, এটা হতে পারে না। ব্যক্তিগত জীবন বলে অবশ্যই কিছু আছে। সবারই আত্মীয়-প্রিয়জন, বন্ধু, সমাজ, শখ – এসব নিয়েই জীবন কাটাতে হয়।

বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানকে সময় দেয়াটা মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জনের জন্য, আর সবকিছু বাদ দিয়ে নিবিড় ভাবে কাজ করে যাওয়াটাও জরুরী। আর আপনি যখন ব্রায়ান ও মাইকেলের পদ্ধতিতে কাজ করবেন – তখন তো এটা আইনের মত। তাহলে? – আপনাকে যেটা করতে হবে, তা হল প্রতিটি দিন কতটা সময় কাজ করবেন তা হিসেব করে বের করা। এবং এই নির্দিষ্ট সময়টিতে অন্য কিছু করতে পারবেন না। এই সময়ের পুরোটাই লক্ষ্যপূরণের কাজে লাগাবেন।

দ্রুত কাজ করার উপায়

আর এই কাজের বাইরে ভবিষ্য‌ৎ পরিকল্পনা ও আগের কাজ পর্যালোচনা করার জন্যও সময় বরাদ্দ রাখতে হবে। নাহলে আপনি খেই হারিয়ে ফেলবেন। এই সময়টিতে কৌশল পর্যালোচনা ও ঠিকঠাক করবেন। এর জন্য দিনের সেরা একটি সময় বেছে নিতে হবে -–যখন আপনার বুদ্ধি সবচেয়ে পরিস্কার ভাবে কাজ করে। হতে পারে সেটা সকাল, বা সন্ধ্যার পরে। আপনার সুবিধা মত সময় বেছে নিন। কিন্তু সময়টা যেন শতভাগ কাজে লাগে। খেয়াল রাখবেন, এই সময়টাতে যেন কোনও ফোনকল, মেসেজ, সোশ্যাল নোটিফিকেশান, ইমেইল আপনার মনোযোগী হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা না দিতে পারে।

নতুন নতুন যেসব সুযোগ আসবে, সেসব বিবেচনার জন্যও নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ রাখুন। একটির মাঝে আরেকটি কাজ ঢোকাবেন না। তাহলে কোনও কাজই ঠিকমত হবে না। যে সময় যে কাজের জন্য বরাদ্দ রেখেছেন, সেই সময়টা সেই কাজেই লাগান। তাহলেই দেখবেন স্বাভাবিকের চেয়ে কত দ্রুত কাজ শেষ করতে পারছেন।

পরিশিষ্ট:

আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত সফল মানুষ এসেছেন, তাঁরা সবাই আসলে একটি কাজ খুব ভাল পারতেন। আর তা হল, সময়ের সঠিক ব্যবহার। “12 week year” এর দুই লেখক সেইসব সফল মানুষদের মত করে সময়ের ব্যবহার করার একটি উপায় বাতলেছেন।
ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও তাঁদের তত্ব কাজে লাগিয়ে অনেকেই পারফর্মেন্সকে অভাবনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। আপনিও চাইলে এই পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে জীবনের গতি অনেকটা দ্রুত করে নিতে পারেন।


লেখাটি কেমন লাগলো তা আমাদের কমেন্ট করে জানান। আপনার প্রতিটি মতামতই আমাদের জন্য অমূল্য। আর যদি মনে হয় লেখাটি মানুষের কাজে লাগবে – তাহলে শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন। আমাদের সাথে থাকুন। সাফল্যের পথে প্রতিটি পদক্ষেপে লড়াকু আপনার সাথে আছে। কারণ আপনার সাফল্যেই আমাদের সার্থকতা।

One thought on “দ্রুত কাজ করার উপায়: ১২ মাসের কাজ মাত্র ১২ সপ্তাহে শেষ করুন – (বুক রিভিউ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *