হাই পারফর্মারদের ৬টি অভ্যাস: যেভাবে সাধারন মানুষেরা অসাধারন হয়ে ওঠেন – (বুক রিভিউ)


  • By
  • March 14th, 2018
  •    
  • পড়তে সময় লাগবে: 5 minutes
  • 2,782 views

বেস্ট সেলিং লেখক ও মটিভেশনাল স্পিকার ব্রেন্ডন বারচার্ড তাঁর “High Performance Habits: How Extraordinary People Become That Way” বইতে অসাধারন মানুষদের ৬টি অভ্যাসের কথা বলেছেন যেগুলো চর্চা করলে আপনিও সেইসব টপ লেভেল হাই পারফর্মারদের একজন হতে পারেন। বারচার্ডের বইটির আকার যদিও ৪০০ পৃষ্ঠা, আমরা এখানে বইয়ের মূল কথা গুলো আপনার জন্য সারাংশ আকারে তুলে ধরব।

হাই পারফর্মার হলেন সেসব লোক, যাঁরা নিজেদের ক্ষমতা অনুযায়ী সেরা কাজটি  করে সেরা ফলাফল বের করে আনতে পারেন।

সুপার পাওয়ার লেভেলের দক্ষতা ও প্রতিভা না থাকলেও কিছু কিছু মানুষ অন্যদের চেয়ে এগিয়ে যান কারণ তাঁরা “হাই পারফর্মার”।

উদাহরন হিসেবে ধরা যাক রতন এবং সুমনের এর একটি করে গাড়ি আছে। দু’টিরই কনফিগারেশন এক, দু’টি একই সময়ে কেনা। কিন্তু রতন এর গাড়িটি অনেক ভাল কাজ করছে, অন্য কথায় সেটি কনফিগারেশন অনুযায়ী পারফর্মেন্স করছে। সুমন এর গাড়িটি একই জিনিস হওয়ার পরও ঠিকমত পারফর্ম করছে না। এটি কিন্তু গাড়ির দোষ না।

রতন তার গাড়িটিকে সঠিক ভাবে চালাচ্ছে ও মেইনটেন করছে বলেই সে গাড়িটি থেকে ভাল পারফর্মেন্স পাচ্ছে।

মানুষের ক্ষেত্রেও এই ব্যাপারটি ঘটে। সমান দক্ষতা থাকলেও একজন আরেকজনের চেয়ে ভাল কাজ করতে পারে যদি সে একজন হাই পারফর্মার হয়।

হাই পারফর্মার বা উচ্চকর্মক্ষমতা সম্পন্ন মানুষগুলোই সবখানে সেরা জায়গাগুলো দখল করে রাখে।  

ব্যবসার ক্ষেত্রেই হোক, পারিবারিক ক্ষেত্রেই হোক, সামাজিক, রাজনৈতিক, চাকরি ক্ষেত্র – সবখানেই  একই চিত্র। এবং টপ পজিশন যেমন কম, তেমনি হাই পারফর্মারের সংখ্যাও কিন্তু কম।

এর একটি প্রধান কারণ, হাই পারফর্মাররা ঠিক সাধারণ মানুষের মত নন। তাহলে কি তারা সুপারহিরো ধরনের কিছু? – না, সুপারহিরো শুধু গল্পের বই আর সিনেমার পর্দাতেই আছে।

হাই পারফর্মাররা আপনার আমার মতই সাধারণ মানুষ। কিন্তু কিছু অভ্যাস অনুশীলনের মাধ্যমে তারা হাই পারফর্মারে পরিনত হন। এই অভ্যাস গুলোর কথাই আমরা জানবো ব্রেনডন বারচার্ড এর “হাই পারফর্মেন্স হ্যাবিটস” বইয়ের এর বুক রিভিউ থেকে। 

তবে বইয়ের জগতে প্রবেশ করার আগে চলুন লেখকের ব্যাপারে একটু জেনে নেয়া যাক। তাঁর জীবনের গল্পটিও কিন্তু আমাদের জন্য কম অনুপ্রেরণার নয়।

brendon barchard

 

ব্রেনডনের মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয়ার যাত্রা শুরু হয় ১৯ বছর বয়সে। সেই সময়ে একটি ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা থেকে কোনওরকমে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

দুর্ঘটনায় পড়ার আগে তিনি বেশ কিছুদিন ধরে ডিপ্রেশনে ভুগছিলেন। বেঁচে যাওয়ার পর তার মাঝে একটি উপলব্ধি জন্মায়।

তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে “আমি কি এতদিন সঠিক ভাবে জীবনযাপন করেছি?,”  “আমি কি নি:স্বার্থ ভাবে ভালবাসতে পেরেছি?,” “আমি কি পৃথিবীর বুকে আমার চিহ্ন রাখতে পেরেছি?”

– এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি নিজের মুক্তির পথও খুঁজে পান, আর সেই সাথে খুঁজে পান তাঁর জীবনের সত্যিকার লক্ষ্য: অন্যদের সুন্দর ভাবে বাঁচতে সাহায্য করা।

brendon burchard quote

২০ থেকে ৩০ বছর বয়সটি তিনি সাইকোলজি ও নেতৃত্বের বিষয়ে গবেষণা করেন এবং এ্যাকসেন্টারে (Accenture)পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।  ৩২ বছর বয়সে ব্রেন্ডন একজন বেস্ট সেলিং লেখকে পরিনত হন।

সেই সাথে হয়ে যান একজন প্রথম সারির হাই পারফর্মেন্স কোচ ও মটিভেশনাল স্পিকার। বর্তমানে তিনি বিশ্বের সেরা একজন হাই পারফর্মেন্স কোচ হিসেবে স্বীকৃত (সাকসেস ম্যাগাজিন এবং ওপরাহ্ ডট কম এর তথ্য)।

ল্যারি কিং তাঁকে পৃথিবীর অন্যতম সেরা একজন মোটিভেশন ও মার্কেটিং ট্রেইনার হিসেবে অভিহিত করেছেন। সাকসেস ম্যাগাজিনের হিসেবে তিনি বর্তমান বিশ্বে self development বা আত্মউন্নয়ন বিষয়ে সেরা ২৫ জন প্রভাবশালীর একজন। এবং ফেসবুকের হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি ফলোয়ার থাকা ১০০ জন  মানুষদের একজন তিনি।

এসব সাফল্য তিনি  খুবই স্বল্প সময়ে অর্জন করেছেন। এবং এমন একজন লোক যখন সফল মানুষদের অভ্যস নিয়ে আলোচনা করেন, তাতে কান দেয়াটা অবশ্যই বুদ্ধিমানের কাজ।

তো চলুন জেনে নেয়া যাক এই লেখকের বইয়ে লেখা ৬টি অভ্যাস, যা রপ্ত করলে একজন সত্যিকারের হাই পারফর্মার হওয়া যাবে।

অভ্যাস ০১: সবসময় নিজেকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করুন

লেখক আমাদের একটি জিনিস খুব ভালকরে বুঝতে বলেন যে, হাই পারফর্মাররাও হয়তো সবসময়ে সবকিছু পারফেক্ট ভাবে করতে পারেন না, কিন্তু তাঁরা সব সময়েই তা করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন।

পাওয়া না পাওয়াটা সব সময়ে আপনার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু হাই পারফর্মাররা সব সময়েই চেষ্টা করেন তাঁদের সমস্ত কাজ নিখুঁত ভাবে করতে।

তাঁরা দিনের কাজের শিডিউল সাজানোর ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে অন্যদের তুলনায় অন্তত ৭৪ মিনিট সময় বেশি ব্যয় করেন।

লেখক বলেন, সফল মানুষেরা তাদের ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনে কি পরিবর্তন আনবেন সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ‘নিউ ইয়ার’ আসার অপেক্ষা করেন না, তারা সব সময়েই নিজেকে নিয়ে গবেষণা করতে থাকেন।

এধরনের মানুষ  সব সময়েই সবচেয়ে জরুরী কাজটি আগে রাখেন, যা তাদের অপ্রয়োজনীয় বিষয় ছেড়ে সত্যিকার জরুরী বিষয়ের প্রতি মনযোগী রাখে।

লেখকের পর্যবেক্ষন অনুযায়ী, সবচেয়ে জরুরী কাজটি খুঁজে পেতে আপনাকে জীবনের চারটি দিকে মনযোগ দিতে হবে : ব্যক্তিগত, দক্ষতা, সামাজিক ক্ষেত্র, ও সেবা।

আরেকটু বিস্তারিত বললে বলা যায় হাই পারফর্মাররা নিজেদেরকে সব সময়ে ৪টি প্রশ্ন করেন :

আপনি নিজেকে কেমন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করতে পছন্দ করবেন?

আপনি সামাজিক ভাবে কোন ধরনের আচরণ করতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করবেন?

কি কি দক্ষতা আপনি অর্জন করতে ও দেখাতে চান?

আপনি মানুষকে কোন ধরনের সেবা দিতে চান?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যখন আপনি খুঁজে পাবেন, তখন আপনি আরও ভালভাবে সাফল্যের পথে চলা শুরু করবেন।

অভ্যাস ০২: হারানো শক্তিকে আবার ফিরিয়ে আনুন

এই বিষয়ে লেখকের পর্যবেক্ষন হলো, বেশিরভাগ মানুষই সাধারনত দুপুর ২টা থেকে ৩টার ভেতরে তাদের শক্তির একটি বড় অংশ খরচ করে ফেলে। তাই তারা দিন শেষ হওয়ার আগেই এনার্জি হারিয়ে ক্লান্ত হয়ে যায়।

কিন্তু কিছু অসাধারন মানুষ অনেক বেশি সময় ধরে তাঁদের শক্তি ধরে রাখতে পারেন।  লেখক তাঁর গবেষণায় দেখেছেন, বেশিরভাগ মানুষ আসলে একই দিনে কোনও ব্রেক ছাড়াই নানান ধরনের চিন্তা ও কাজের মাঝ দিয়ে যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে হাই পারফর্মাররা এক কাজ থেকে আরেক কাজে যাওয়ার মাঝে ছোট ছোট ব্রেক নেন যা তাঁদের পরবর্তী কাজের জন্য আবার আগের মত শক্তিশালী করে তোলে।

অনেকেই দুই কাজের মধ্যবর্তী সময়ে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ধ্যান করে। এটি তাদের বিশ্রাম ও স্বস্তি দেয় এবং ঠান্ডা মাথায় তাঁদের পরবর্তী কাজ নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ দেয়। এর ফলে পরের কাজের জন্য এক নতুন উদ্যম সৃষ্টি হয়।

হাই পারফর্মারা সারাদিন এই ছোট ছোট বিরতির মধ্যদিয়ে নিজেদেরকে ‘রিচার্জ’ করে নেন এবং শক্তি হারানোর বদলে নতুন করে শক্তি অর্জন করেন।

লেখকের মতে আপনি যদি সারাদিন চাঙ্গা থেকে আরও বেশি পরিমানে কাজ করতে চান, তাহলে অবশ্যই আপনার শরীর ও মস্তিষ্ককে মাঝে মাঝে কিছুটা বিশ্রাম দিতে হবে।

কাজের মাঝেও অন্তত ৪০ মিনিট থেকে ১ঘন্টা আপনার শরীর ও মস্তিষ্ককে সবধরনের চাপ থেকে মুক্ত রাখুন। এটি খুবই জরুরী একটি বিষয়, তাই আপনার দৈনিক কাজের রুটিনে এই বিষয়টিও গুরুত্ব দিন।

আমরা সবাই জানি স্বাস্থ্যই সম্পদ। আপনাকে কর্ম জীবনে সফল হতে গেলে অবশ্যই পুরো মাত্রায় সুস্থ থাকতে হবে। বড় সাফল্য পেতে হলে অবশ্যই আপনাকে পুরোপুরি  এ্যাকটিভ থাকতে হবে।

আপনি নিশ্চই কাঠুরে ও কুড়ালের গল্পটি শুনেছেন? শুনে থাকলে আরেকবার শুনুন, আর না শোনা থাকলে শুনুন এবং মনে রাখুন।

একজন খুবই দক্ষ ও পরিশ্রমী কাঠুরে প্রচুর কাঠ কাটতে পারত। কাঠ কেটে বিক্রি করে তার দিন ভালই যাচ্ছিল। কিন্তু এই কাজের মাঝে সে একটি বড় ভুল করছিল।

সে কাঠ কাটতো ঠিকই, কিন্তু কখনওই তার কুড়ালের অবস্থার দিকে নজর দিতোনা। কাঠ কাটতে কাটতে কুড়ালটির ধার ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছিল কিন্তু কাঠুরে কুড়াল ধার দেয়ার বদলে আরও জোরের সাথে কাঠ কাটতে শুরু করল।

কুড়ালের ধারের বদলে তার সমস্ত মনযোগ ছিল কাজের ফলাফল, মানে কাঠের দিকে। কিন্তু কুড়ালের ধার কমে যাওয়ার সাথে সাথে কাঠুরের কাঠের পরিমানও দিনে দিনে কমে যেতে লাগল এবং এক পর্যায়ে কুড়ালটির এমন অবস্থা হল যে তা দিয়ে কাঠ কাটা অসম্ভব হয়ে গেল।

আপনার শরীর আর মস্তিষ্কও সেই কাঠুরের কুড়ালের মত। আপনি যদি ঠিকমত এর যত্ন না করেন তাহলে আপনিও ধীরে ধীরে কাজের এনার্জি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবেন। 

আপনি যদি আপনার স্বাস্থ্যের দিকে নজর না দিয়ে শুধু কাজের দিকে এবং কাজের ফলাফলের দিকে নজর দেন, তাহলে আপনার কাজ করার শক্তি দিন দিন কমতেই থাকবে।

সাধারন মানুষ সাধারনত এই ব্যাপারটি ভুলে গিয়ে কাজ করে চলে এবং ধীরে ধীরে নিজেদের কর্মক্ষমতা শেষ করে ফেলে

আপনি ছোট প্রজেক্ট করুন, বা বড় প্রজেক্ট, ঠিকমত নিজের যত্ন না নিলে শরীরে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। হাই পারফর্মাররা তাই নিয়মিত নিজের শরীরের যত্ন নেন।

অভ্যাস ০৩: কাজকে ‘প্রয়োজন’ বানিয়ে ফেলুন

কথাটা শুনতে একটু বেখাপ্পা  লাগতে পারে। কাজ তো আমরা প্রয়োজনেই করি। কিন্তু সেই প্রয়োজনটা কতটুকু? সেটা কি আমাদের পুরোটা দেয়ার জন্য যথেষ্ঠ?

ব্রেনডনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী হাই পারফর্মাররা মানসিক অনুপ্রেরণা কে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেয়ার জন্য কাজে হাত দেয়ার আগে নিজেদের একটি প্রশ্ন করেন : “কেন আমাকে এই কাজটি এতটা ভালভাবে করতে হবে?”

হাই পারফর্মাররা তাদের কাজকে সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার মনে করেন। তারা নিজেদের দেহ আর মনের পুরোটা কাজে ঢেলে দেন। তাদের ক্ষেত্রে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করাটাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

লেখকের মতে, আপনি যদি কাজকে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন বানাতে চান, তবে নিজেকে প্রশ্ন করুন কার জন্য এই কাজটি করছেন? নিজের প্রতি প্রশ্ন রাখুন, এই মূহুর্তে কে আমার সাফল্য সবচেয়ে বেশি দেখতে চায়? কার জন্য আমার এই কাজটি করা জরুরী?

এটা হতে পারে আপনার পরিবার, বন্ধু, আপনার স্ত্রী/স্বামী, আপনার ক্রেতা, অথবা আপনি নিজে।

আমাদের নিজের কাছেই নিজেদের প্রমাণ করা, নিজের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস অর্জন করাটা সবচেয়ে বেশি জরুরী। নিজের কাছে নিজের সীমাবদ্ধতা জয় করে দেখালে আপনার আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে যাবে।

এই প্রয়োজনীয়তার অনুভূতি নিজের মাঝে সৃষ্টি করতে পারলে আপনার কাজের মান ও দক্ষতা অনেক বেড়ে যাবে। কাজকে একবার ভালোবাসতে পারলে আপনার কর্মক্ষমতা আপনাকেই হয়তো অবাক করে দেবে।

কাজেই, কাজকে প্রয়োজন বানানোর জন্য নিজের মনকে ট্রেইনিং দিন – আপনি এমনিতেই হাই পারফর্মার হয়ে উঠবেন।

অভ্যাস ০৪: কর্মদক্ষতা বাড়ান

যদিও পুরো বইটিই  আসলে কর্মদক্ষতা বাড়ানোর বিষয়ে, তারপরও এটিকে একটি অভ্যাস হিসেবে লেখক তাঁর বইয়ে রেখেছেন।

কর্মদক্ষতা বাড়ানোর ব্যাপারে যে জিনিসটি আপনাকে সচচেয়ে বেশি সহায়তা করবে, তা হল একেবারে মূল বিষয়টির প্রতি মনযোগ দেয়া।

অনেকের কাজের দক্ষতা থাকলেও মূল কাজের পাশাপাশি অনেক অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের ওপর মনযোগ চলে যায়, যা আপনার অজান্তেই আপনার পুরো কর্মক্ষমতা কাজে লাগাতে দেয় না।

কাজেই, আপনি যদি খুঁজে বের করতে পারেন যে, কোন কাজটি করা এখন আসলেই জরুরী, তাহলে আপনি অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে মূল কাজে মনোযোগী হতে পারবেন। এর ফলে এমনিতেই আপনার কর্মক্ষমতা বেড়ে যাবে।

লেখক অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস্‌ এর উদাহরন দিয়ে বলেছেন:

“এ্যাপল যখন একটি বড় কাজের অর্ডার পেল, জবস্‌ তাঁর প্রোডাক্ট লাইন থেকে সকল আপাতত অপ্রয়োজনীয় পন্য বাদ দিয়ে বর্তমানে যেটি জরুরী সেটির ওপর সমস্ত দক্ষতা নিয়োগ করলেন। যার ফলে হাতের কাজের গতি অনেক বেড়ে গিয়েছিল।”

লেখক ব্রেনডনের মতে, হাই পারফর্মাররা অনেক বেশি কর্মদক্ষ হওয়ার কারণ, তাঁরা যখন সামনে পাঁচটি পদক্ষেপ দেখতে পান তখন প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য আলাদা ভাবে নিজেদের প্রস্তুত করেন এবং একে একে কাজগুলো সারেন। সব কাজে একবারে হাত দেন না।

এখানে লেখক আমাদের কাজের মূহু্র্তে প্রয়োজনীয়, কম প্রয়োজনীয়, এবং অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো আলাদা করে বোঝার জন্য বলেছেন।  আমরা যখন বিষয়গুলো চিহ্নিত করে শুধু প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর ওপর মনযোগ দেব, তখন কাজে সফল হওয়ার সম্ভাবনা কয়েক গুন বেড়ে যাবে।

অভ্যাস ০৫: নিজের প্রভাব বিস্তার করুন

লেখকের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, হাই পারফর্মাররা অন্যদের উন্নতির জন্য উৎসাহ দিয়ে প্রভাব বিস্তার করেন।

হাই ফারফর্মাররা অন্যদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, কিভাবে পজিটিভ চিন্তা মানুষের জীবনকে পরিবর্তন করতে পারে। তাঁরা কঠিন পরিস্থিতে সবকিছু নেতিবাচক ভাবে না দেখে সেই পরিস্থিতিকে ইতিবাচক বা পজিটিভ ভাবে দেখতে শেখান। এবং ইতিবাচক ফলাফল পাওয়ার জন্য অন্যদের উ‌ৎসাহিত করেন।

আপনি যদি কারও জীবন ও চিন্তাকে ইতিবাচক ভাবে প্রভাবিত করতে পারেন, তবেই বলা যায় আপনি আসলেই প্রভাব বিস্তার করছেন।

একজন হাই পারফর্মার অন্যের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ পজিটিভ দিকে পরিবর্তিত করতে সাহায্য করবেন।

এখানে লেখক আমাদের বোঝাতে চান যে, একজন হাই পারফর্মার এমন একজন মানুষ যিনি মানুষের নেতিবাচক চিন্তাকে নিজের প্রভাব খাটিয়ে ইতিবাচক চিন্তায় পরিনত করেন। তাঁরা শুধু নিজের উন্নতির বদলে অন্যদের উন্নতির জন্যও কাজ করেন।

তাঁরা নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা খুশি মনে অন্যকে শেখান। বিপদে পড়া মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় শেখান। সোজা কথায়, তাঁরা নিজের সাধ্যমত অন্যদের সাহায্য করেন – আর এভাবেই তাঁরা অন্যদের পজিটিভ ভাবে প্রভাবিত করেন।

অভ্যাস ০৬: দৃঢ়তা প্রদর্শন করুন

বিস্তারিত গবেষণার পর লেখক জানতে পেরেছেন, যখন একজন হাই পারফর্মার কঠিন পরিস্থিতি, মানসিক চাপ, অথবা ভয়ের সামনে পড়েন, তখন বিশেষ কিছু কাজ করেন।

এসব পরিস্থিতিতে চুপ না থেকে হাই পারফর্মাররা নিজেদের অবস্থা ‍ও পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা করেন। নিজেদের ছাড়াও তারা অন্যদের জন্যও কথা বলেন। হাই পারফর্মাররা সাধারণ মানুষের তুলনায় নিজের ব্যাপারে অনেক বেশি খোলামেলা থাকেন।

তাঁরা সংগ্রাম করাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। তাঁরা জানেন সংগ্রাম হলো সাফল্য সিঁড়ির একটি জরুরী ধাপ। তাঁরা বোঝেন যে এই সংগ্রাম তাঁদের সাহস বৃদ্ধি করার সাথে সাথে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। তাঁরা আগে থেকেই জানেন সাফল্যের পথে যাত্রা কঠিন হবে, এবং সেইজন্য তাঁরা মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকেন।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষ এসবের ব্যাপারে অভিযোগ করে অনেক সময়ে কাজ করাই থামিয়ে দেয়।

একজন হাই পারফর্মার সব সময়েই জানেন, বড় সাফল্য পেতে কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়। অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। তাঁরা কঠিন সময় বা পরিস্থিতি এলে সেখান থেকে ছুটে পালান না অথবা নিরাপদে থাকার চেষ্টাও করেন না। তারা বাস্তবতার মুখোমুখী হয়ে লড়াই চালিয়ে যান। কারণ সব পরিস্থিতিতেই তাঁরা সফল হতে চান, তাই যে কোনও খারাপ পরিস্থিতিতে তাঁরা দৃঢ়তার পরিচয় দেন।

পরিশিষ্ট:

পুরো লেখাটি পড়া শেষ করার জন্য আপনাকে অভিনন্দন। তবে আমরা আশা করব শুধু পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আপনি এই অভ্যাসগুলোকে বাস্তব জীবনেও কাজে লাগাবেন। বইটি আসলে একটি গবেষণা পত্র। এই বইয়ের জন্য গবেষণা করতে গিয়ে লেখক তাঁর দেখা সেরা কিছু হাই পারফর্মারের জীবনযাপনের ধরন খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন।

এই পর্যবেক্ষণের ফলাফল হিসেবে তিনি ৬টি অভ্যাস খুঁজে পেয়েছেন যা সব হাই পারফর্মারদের মাঝেই রয়েছে। লেখকের মতে আপনি যদি এই ছয়টি অভ্যাস রপ্ত ও চর্চা করতে পারেন, তাহলে প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় আপনি জীবনে সাফল্যের ‍মুখ দেখবেন।

লেখক ব্রেনডন বারচার্ড বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে সফল মানুষদের একজন এবং সবথেকে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া হাই পারফর্মেন্স কোচ। তাঁর পরামর্শ অনুসরন করে বহু মানুষ জীবন বদলে ফেলেছেন। আপনি কেন তাদের মধ্যে একজন হতে পারবেন না?

সবশেষে এই লেখাটির ব্যাপারে আপনার মতামত কমেন্ট করে আমাদের জানান। লেখাটি ভাল লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।

নতুন নতুন তথ্যভিত্তিক,  আত্মউন্নয়ন এবং মোটিভেশনাল কন্টেন্টের জন্য লড়াকুর সাথে থাকুন। সাফল্যের পথে লড়াকু সবসময়েই আপনার সাথে আছে।

2 thoughts on “হাই পারফর্মারদের ৬টি অভ্যাস: যেভাবে সাধারন মানুষেরা অসাধারন হয়ে ওঠেন – (বুক রিভিউ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *