এনার্জি বৃদ্ধির ১১ উপায়: সারাদিন কাজ করেও এনার্জি ধরে রাখুন


এনার্জি বৃদ্ধির উপায় জানার আগে চলুন দুইজন মানুষ সম্পর্কে একটু জানি: শরীফ সাহেব আর আজাদ সাহেব একই অফিসে, একই পোস্টে কাজ করেন। শরীফ সাহেব দুপুরের পরপরই দারুন ক্লান্ত অনুভব করতে শুরু করেন। কাজ করতেই ইচ্ছা করে না। আর দিন শেষে তো ক্লান্তির শেষ সীমায় চলে যান। বাসায় গিয়ে কোনওরকমে খাওয়া সেরেই ঘুমিয়ে পড়েন তিনি।

অন্যদিকে আজাদ সাহেব একই কাজ করলেও দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর এনার্জির কোনও অভাব হয় না।

৮ ঘন্টা কাজ করার পরও তাঁকে দেখে মনে হয় আরও চার-পাঁচ ঘন্টা কাজ করতে পারবেন। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে তিনি ঘন্টাখানেক পড়াশুনা করেন, তারপর পরিবারকে সময় দেন, সেই সাথে বাড়তি আয়ের জন্য অনলাইনে একটু ফ্রিল্যান্সিংও করেন। এই লোকটি এমন কি এনার্জি বৃদ্ধির উপায় জানেন যে এত কাজ করেও তিনি ক্লান্ত হন না?

আপনি চাকরি বা ব্যবসা যেটাই করেন – কাজ করলে ক্লান্তি আসবেই – এটাই সবার ধারণা।

এই ক্লান্তির জন্য যে শুধু শারীরিক পরিশ্রম দায়ী – ব্যাপারটা সেরকম নয়। মানসিক চাপ, রেস্ট নিতে না পারা – এগুলোও মানুষকে ক্লান্ত করে ফেলে।

তবে, কিছু নিয়ম মেনে চললে কাজের মাঝে ক্লান্তি তো আসবেই না, সেই সাথে অফিস শেষেও চাঙ্গা থাকবেন।

সারাদিনের কাজ শেষে ‘ক্লান্ত’ হয়ে যাওয়াটা আপনি চাইলেই বন্ধ করতে পারবেন। এনার্জি বৃদ্ধির কিছু সাধারণ উপায় জানলে সারাদিন কাজ করেও আজাদ সাহেবের মত চাঙ্গা থাকতে পারবেন।

চলুন, এটা সম্ভব করতে পারে এমন ১১টি এনার্জি বৃদ্ধি করার উপায় বা নিয়ম জেনে নেয়া যাক।

০১. দিনের শুরুতে পুষ্টিকর ও এনার্জি বৃদ্ধি করে এমন খাবার খান

good breakfast, এনার্জি বৃদ্ধির উপায়

সকালের নাস্তা ঠিকমত না করা একটি বড় বদ অভ্যাস। বেশিরভাগ মানুষই দুপুরের খাবার অফিসে খান, এবং সেক্ষেত্রে নিজের পছন্দমত খাবার পাওয়া কঠিন। সারাদিন এনার্জি ধরে রাখতে শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান দেয়াটা জরুরী। আর এই কাজটা দিনের শুরুতেই করতে পারলে সবচেয়ে ভালো । দুপুরে খুব বেশি খেলে শরীর ছেড়ে দেয়ার ফলে কিছুটা ক্লান্ত লাগে। এর ফলে ঠিক মত কাজ করা যায় না। তাই দিনের শুরুতেই সবচেয়ে বড় আহারটি করা উচি‌ৎ।

আমরা বেশিরভাগই সকাল বেলা রুটি, ডিম, চা-কফি, কলা – ইত্যাদি দিয়ে নাস্তা করি। এসব খাবারে সব ধরনের পুষ্টি উপাদান থাকে না। সকালের খাবার এমন হওয়া উচি‌ৎ যেখানে সব ধরনের পুষ্টি উপাদান যেমন, শর্করা, আমিষ, ভিটামিন প্রয়োজনীয় মাত্রায় থাকে। এটা আপনাকে সারাদিন চাঙ্গা রাখবে।

সকালের মেনুতে ভাত/রুটির সাথে সব্জী, ডিম/মাছ/মাংস, ফল, এবং সম্ভব হলে দুধ ও মধু রাখার চেষ্টা করুন। রোজ সকালে করলার জুস খেলেও অনেক চাঙ্গা লাগবে।

এনার্জি ধরে রাখার জন্য সারাদিন প্রচুর পরিমান পানি পান করুন। হাতের কাছে সব সময়ে একটি ছোট পানির বোতল রাখুন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ৫-১০ মিনিট পরপরই পানি খান। এতে শরীরে জড়তা আসবে না।
অফিসে অন্তত ২ কাপ ব্ল্যাক কফি পান করুন। সকালে কাজে যাবার আগে বা অফিসে ঢোকার পর, দুপুরে খাওয়ার পর এবং সন্ধ্যার আগে আগে এক কাপ করে কফি আপনাকে ঘুম ঘুম ভাব হওয়া, চোখ জ্বালাপোড়া করা ও মাথা ভার হওয়া থেকে বাঁচাবে। তবে দুধ চা এড়িয়ে চলাই ভালো। চা খাওয়ার অভ্যাস থাকলে লাল চা অথবা গ্রিন-টি পান করুন। অফিসে চা-কফির ব্যবস্থা না থাকলে ফ্লাস্কে করে নিজেই নিয়ে যেতে পারেন।

০২. সঠিক ভাবে ডেস্কে বসুন

Man Sitting on Chair at work

চেয়ার-টেবিল বা ডেস্কে বসে কাজ করলে শরীর ধরে যাওয়াটা খুব স্বাভাবিক। শরীর ধরে যাওয়ার ফলে, গা ম্যাজম্যাজ করে এবং ক্লান্তি অনুভব হয়।

তবে ঠিকভাবে বসলে এত ক্লান্ত লাগবে না। খুব বেশি রিল্যাক্সড এবং খুব বেশি টাইট হয়ে বসা – দু’টোই খারাপ। কম্পিউটারে বা কাগজ কলমে কাজ করার সময়ে খুব বেশি পেছনে হেলান দিয়ে বা সামনের দিকে ঝুঁকে বসবেন না। দুই ভাবেই আপনার পিঠে ও মেরুদন্ডে চাপ পড়ে। এতে পিঠ ও বাহু আড়ষ্ট হয়ে যায়, ফলে অস্বস্তি ও ঝিমানো ভাব চলে আসে। সেই সাথে ব্যাক পেইন হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সবচেয়ে ভালো হয় যদি পিঠ সোজা করে বসে কাজ করতে পারেন। প্রয়োজনে মাঝারি সাইজের একটি কুশনে পিঠ ঠেকিয়ে বসে কাজ করুন। এতে এমনিতেই আপনার পিঠ সোজা হয়ে থাকবে, কিন্তু কোমরে চাপ পড়বে না। পিঠ এবং কাঁধ আড়ষ্টও হবে না। ব্যাক পেইনের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতিটি খুব কার্যকর।

আপনি যদি কম্পিউটারে কাজ করেন, তবে খেয়াল রাখুন যেন কম্পিউটারের কিবোর্ড ও মাউস কনুইয়ের সমান্তরালে থাকে। কাঁধ যেন স্বাভাবিকের চেয়ে উঁচু বা নিচু অবস্থায় রাখতে না হয়। এতে করে কিছুক্ষণ কাজ করার পরই কাঁধ আড়ষ্ট হবে না। কাঁধ আড়স্ট হয়ে গেলে কাঁধে ও ঘাড়ে ব্যাথা, ম্যাজম্যাজ করা, হাত অবশ হওয়া – এসব হতে পারে। এতে কাজে অসুবিধার সাথে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়। চাঙ্গা থেকে অনেক্ষণ কম্পিউটারে কাজ করতে চাইলে অবশ্যই এটা করুন।
এই কথা কাগজ কলমে কাজ করার বেলায়ও খাটে। ঘাড় গুঁজে বা মেরুদন্ড বাঁকা করে কাজ করলেও একই ধরনের অসুবিধা হয়। কাজেই কাগজ কলমের কাজের সময়েও সোজা হয়ে বসুন।

০৩. একটানা বেশিক্ষণ বসে থাকবেন না

অনেক্ষণ এক নাগাড়ে বসে থাকলে পিঠ ধরে যায়। হাত-পায়ের জয়েন্টগুলো আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। এমনকি যদি সঠিক ভাবে বসেও কাজ করেন – তবুও অনেক্ষণ একটানা বসে থাকবেন না। সবচেয়ে ভালো উপায় হল, প্রতি ২৫ মিনিট পরপর ৫ মিনিট একটু হাঁটাহাঁটি করা ও শরীর বাঁকিয়ে হাল্কা ব্যায়াম করা।

শরীরকে চাঙ্গা রাখার জন্য রক্তচলাচল গতিশীল রাখা খুব জরুরী। টানা বসে থাকলে রক্তচলাচল ধীর হয়ে পড়ে।ফলে শরীরে ক্লান্তি আসে, মনে হয় এনার্জি নেই।

কাজের গতি ঠিক রেখে শরীরের এনার্জি বৃদ্ধি করতে “পমোডরো টেকনিক” বেশ কাজে আসতে পারে। এই টেকনিকে প্রতিটি ওয়ার্ক সেশনকে ৪টি ২৫ মিনিটের সাব সেশনে ভাগ করা হয়। সব মিলিয়ে, ৪x২৫, মোট ১০০ মিনিটের সেশন। প্রথম ৩টি সাব সেশনে প্রতি ২৫ মিনিট পর পর ৫ মিনিটের একটি ব্রেক নিতে হয়। এই ব্রেকের সময়ে আপনি অবশ্যই চেয়ার ছেড়ে উঠবেন এবং একটু হাঁটাহাঁটি করবেন। ৪ নম্বর সাব সেশন, অর্থা‌ৎ শেষ ২৫ মিনিটের সেশন শেষ করে ১৫-২০ মিনিটের একটি বড় ব্রেক নিন। তারপর আবার ১০০ মিনিটের আরেকটি সেশন শুরু করুন।

এই পদ্ধতিতে কাজ করলে, কাজে যেমন ফোকাস থাকবে, তেমনি এনার্জিও থাকবে। এখানে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি ২৫ মিনিটের সেশনে আপনার মনযোগ যেন শুধু হাতের কাজটির ওপরেই থাকে। ফোকাস শিফট হলে মস্তিষ্ক দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পরের একটি পয়েন্টে এই ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করব।

০৪. চোখের ওপর থেকে চাপ কমান

eyes of man

আপনার কি দিনের কাজ শেষে বা দিনের মাঝামাঝি সময়ে চোখ বা মাথায় হাল্কা যন্ত্রণা হয়? একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর কিছু পড়তে গেলে, বা গভীর ভাবে কিছু ভাবতে গেলে ক্লান্তি চলে আসে?

এটা আজকাল একটি কমন সমস্যা। অনেকেই এই সমস্যার সঠিক কারণটি জানেন না। এটি মূলত অনেক সময় ধরে কম্পিউটারের সামনে কাজ করার ফল।

আগের পয়েন্টে বলা ব্রেক নেয়ার পদ্ধতি এখানে বেশ কাজে আসতে পারে। তবে ২৫ মিনিট পর পর ব্রেক নেয়ার পাশাপাশি, প্রতি ২-৩ মিনিটে কয়েক সেকেন্ডের জন্য কম্পিউটারের পর্দা থেকে চোখ সরানো ভালো। কিছুক্ষণ স্ক্রীনের সামনে কাজ করার পর ২০ ফুট দূরের কোনও কিছুর দিকে তাকাতে চেষ্টা করুন। এতে চোখর ওপর চাপ অনেক কম পড়বে।

আজকাল বাজারে এ্যান্টি রিফলেকশন গ্লাস, এ্যান্টি ইউভি গ্লাস বেশ সস্তায় পাওয়া যায়। এই ধরনের গ্লাসের চশমা কম্পিউটার স্ক্রীণ থেকে বের হওয়া অতি বেগুণি রশ্নির আঘাত থেকে চোখকে বাঁচায়। আপনার চোখে সমস্যা না থাকলেও, কম্পিউটারে কাজ করার সময়ে এধরনের একটি পাওয়ারহীন চশমা চোখে দিন। কিছুদিন এটা ব্যবহার করলেই আপনি বুঝতে পারবেন যে এটা আপনার ক্লান্তির মাত্রা কতটা কমিয়ে দিচ্ছে।

এর বাইরে চোখের ব্যায়ামের জন্য বেশকিছু ভালো মোবাইল এ্যাপ রয়েছে। প্লে স্টোর থেকে এগুলোর যে কোনও একটা ডাউনলোড করে নিতে পারেন। কাজের ফাঁকে বা কাজের শেষে মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিট এই ব্যায়াম গুলো করলে চোখের ক্লান্তি অনেকটাই কমে যাবে।

০৫. এক সময়ে একটার বেশি কাজ করবেন না

sand clock vintage hourglass cc0

আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না, মাল্টিটাস্কিং বা এক সময়ে একাধিক কাজ করলে কতটা এনার্জি নষ্ট হয়। এমনকি কাজের ফাঁকে ফেসবুক বা মেসেজ চেক করলেও তা মস্তিষ্ক ক্লান্ত করে।

যখন যে কাজটি করছেন, সেই সময়ে শুধু সেই কাজেই পূর্ণ মনযোগ রাখুন। আপনি চাইলে ব্যাপারটি পরীক্ষা করেও দেখতে পারেন। একদিন একসাথে দুই তিনটি দিকে ফোকাস করে কাজ করুন, পরদিন প্রতিটি সেশনে শুধু একটি কাজেই মনযোগ দিন – আপনি নিজেই পার্থক্যটা ধরতে পারবেন।

কর্মক্ষেত্রে আমাদের নানান ধরনের কাজ করতেই হয়। । রিসার্চ করা, যোগাযোগ রক্ষা করা, রিপোর্ট তৈরী করা – ইত্যাদি নানান ধরনের কাজে আমাদের কর্মদিবস পূর্ণ থাকে। কিন্তু এগুলো যাতে আমাদের এনার্জি শেষ করে না ফেলে – সেইজন্য প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা সময় বরাদ্দ রাখুন।

০৬. সহকর্মীদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখুন

coworkers

মন প্রফুল্ল থাকলে মানসিক চাপ তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। কাজের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ আসবেই। এই চাপ দ্রুত এনার্জি শেষ করে ফেলে। কিন্তু কাজের সময়ে যথেষ্ঠ প্রফুল্ল থাকতে পারলে আপনার মানসিক চাপ অনেক কম থাকবে।

কর্মক্ষেত্রে মন প্রফুল্ল রাখার জন্য কলিগদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখা খুবই জরুরী। কাজের ফাঁকে হাল্কা খোশগল্প, একসাথে একটু চা কফি খাওয়া, কয়েকজন মিলে একসাথে দুপুরে খাওয়া – এগুলো কাজের সময়ে চাপ কমায়।
এছাড়া সব সময়ে যদি মাথায় থাকে যে আশপাশে কিছু কাছের মানুষ রয়েছে, যারা আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল – তাহলে মন অনেকটাই চাঙ্গা থাকে। এটাকে বলা হয় মানসিক নিরাপত্তা বা psychological safety – কাজে প্রোডাক্টিভ থাকতে, ও কাজের এনার্জি বৃদ্ধি করার জন্য এটা দারুন একটি উপায়।

২০১১ সালে প্রকাশিত আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের একটি গবেষণায় দেখা যায়, সহকর্মীদের সাথে যাদের সম্পর্ক ভালো, তারা কম অসুস্থ হয়, ও তাদের বেশিদিন বাঁচার সম্ভাবনা থাকে।

এছাড়া কোনও কাজে আটকে গেলে সহকর্মীদের সাহায্য নেয়াটা দারুন সুবিধাজনক। এতে সময়ের সাথে এনার্জি বাঁচে এবং কাজও ভালো হয়।

০৭. দিনের একটা সময়ে অবশ্যই কিছু শরীরচর্চা করুন

man morning workout

নিয়মিত শরীরচর্চা করা শরীরের এনার্জি বৃদ্ধি ও ধরে রাখার দারুন একটি উপায়।

আগের একটি পয়েন্টে বলেছিলাম টানা বসে থাকলে শরীরে জড়তা চলে আসে। তেমনি নিয়মিত পরিশ্রম না করলেও শরীরে জড়তা সৃষ্টি হয়। ফলে মানুষ ক্ষতিকর মাত্রায় আরামপ্রিয় হয়ে পড়ে ঘন ঘন ঘুম পাওয়া, একটু পরিশ্রমেই ক্লান্ত হয়ে যাওয়া – ইত্যাদি আসলে এই জড়তা ও আরামপ্রিয়তার ফল। এটা কাটাতে নিয়মিত শরীরচর্চার কোনও বিকল্প নেই।

আর আমরা সবাই জানি শরীরের অতিরিক্ত ওজনের সাথে আলস্য এবং দ্রুত ক্লান্ত হয়ে যাওয়ার একটা সম্পর্ক আছে। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে কাজের গতি আর উ‌ৎসাহ কমে যাবে। ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য খাওয়ার দিকে নজর দেয়ার সাথে নিয়মিত শরীরচর্চা করাও জরুরী।

কম করে সপ্তাহে তিন-চার দিন মাত্র আধা ঘন্টার জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা করলে আপনি অনেক ঝরঝরে থাকবেন। দুই থেকে তিন মাস এই অভ্যাস করতে পারলে পরিশ্রমের ক্ষমতা বা ফিটনেস এতটাই বেড়ে যাবে যে আপনাকে ক্লান্ত করাটা বেশ কঠিন হয়ে যাবে।

০৮. ঘুম, বিশ্রাম ও মেডিটেশন

sleeping cat

সারাদিন চাঙ্গা ও পূর্ণ সজাগ থাকার জন্য ভালো ও গভীর ঘুমের কোনও বিকল্প নেই। রাতে ঠিকমত ঘুম না হলে দিনে এনার্জির সাথে কাজ করা যায় না। দিনে অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘন্টা গভীর ঘুম না হলে পুরো মাত্রায় পারফর্ম করা কঠিন।

ঘুমের পাশাপাশি দিনে আধাঘন্টা ধ্যান বা মেডিটেশন করলে মাথা অনেক ঠান্ডা থাকে। চিন্তাগুলো কেন্দ্রীভূত থাকায় গভীর চিন্তা করলেও এনার্জি হারায় না। এছাড়া মেডিটেশনের ফলে শরীরের স্নায়ুগুলো ঢিল হয়, শরীর খুব সহজে ধরে যায় না। আজকাল ইউটিউবে খুঁজলেই প্রচুর সহজ মেডিটেশন পাবেন।

** ৫ মিনিটের সহজ মেডিটেশন:

আপনি যখন অফিসে কাজ করছেন, তখনও এক-দেড় ঘন্টা পরপর ৫ মিনিটের জন্য চোখ বন্ধ করে বসে থাকুন। এই সময়ে চেষ্টা করবেন কোনওকিছু না ভাবার। চোখের সামনের অন্ধকারে ফোকাস করুন।

খুব সাধারন মনে হলেও এটি দারুন কার্যকরী একটি ‘স্মার্ট রেস্ট’ বা ‘শর্ট মেডিটেশন’। এটি করার ফলে আপনার দেহ-মনে নতুন শক্তি সৃষ্টি হবে। এটা করার সময়ে বুক ভরে গভীর দম নিতে পারলে ভালো হয়, তাতে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বাড়বে, শরীর শিথিল বা relaxed হবে। মনে হবে যেন ঘুম থেকে জেগে উঠলেন।

৫ মিনিট যদি না পারেন কিছুক্ষণ পর পর ১৫-২০ সেকেন্ডের জন্যও এটা করলে ক্লান্তি অনেকটা দূর হবে। প্রয়োজনে দুই-তিনবার ৫ মিনিটের জন্য ওয়াশ রুমে গিয়েও এটা করতে পারেন।শুনতে একটু কেমন লাগলেও, এর উপকারিতা দেখলে আপনি নিজেই এই Smart Rest নিতে চাইবেন।

০৯. কালকের কাজের শিডিউল আজই করে রাখুন

জেনে অবাক হবেন, বড় একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে যতটা ব্রেন পাওয়ার খরচ হয়, আজ কোন জামা পরবেন – সেই সিদ্ধান্ত নিতেও তারচেয়ে খুব একটা কম হয় না। এর কারণ মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়া সবখানেই এক। তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সে সিদ্ধান্ত জানায়, এবং আপনি সেই অনুযায়ী কাজ করেন।

যদি দিনের মধ্যে বার বার বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে থাকেন, তবে আপনার মস্তিষ্ক খুব দ্রুতই ক্লান্ত হয়ে পড়বে। আবার একটি কাজ শেষ করার পর যদি ভাবতে হয় যে এরপর কি করবেন – তাতেও অনেক এনার্জি খরচ হয়।

এই সমস্যার খুব সহজ একটি সমাধান আছে। সমাধানটি হল, কাল কি করবেন, তা আজই ঠিক করে রাখা। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় এই কাজে ব্যয় করতে পারেন। সবচেয়ে উপায় আমেরিকান এক্সপ্রেসের সিইও কেনেথ চেনাল্ট এর পদ্ধতি। তিনি আজকের অফিসের কাজ শেষে কালকের প্রধান কয়েকটি কাজ একটি কাগজে নোট করে তারপর বের হন।
এতে দিনের শুরুতেই তাঁকে করনীয় নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। এই এনার্জি তিনি দিনের কাজে ব্যবহার করতে পারেন। দিনের শুরুতে, বা দিনে একাধিক বার এসব নিয়ে চিন্তা করতে গেলে অযথা এনার্জি নষ্ট হয়। এর ফলে দ্রুত ক্লান্তি চলে আসে।

১০. ২টি কাজের মাঝের সময়ে একটু বিরতির ব্যবস্থা রাখুন

কর্মক্ষেত্রে আমাদের একের পর এক কাজ করে যেতে হয়। আপনি যদি একজন একাউন্টেন্ট হন তবে আপনাকে হয়তো একই দিনে কর্মচারীদের বেতনের হিসাব, নতুন প্রজেক্টের বাজেট, মজুদ কাঁচামালের হিসাব – ইত্যাদি নানান ধরনের কাজ করতে হয়।

এই কথা সত্যি যে এর সবই হিসাবরক্ষণের মধ্যে পড়ে। কিন্তু একটির চেয়ে আরেকটি একটু হলেও আলাদা। ইংরেজীতে “Residue of Thoughts” বলে একটা কথা আছে। আমরা যখন এক চিন্তা থেকে আরেক চিন্তায় যাই, তখন পেছনের চিন্তাটি পুরোপুরি আমাদের মাথা ছেড়ে যায় না। এক্ষেত্রে নতুন চিন্তা করতে গেলে আগের বিষয়টি মাঝে মাঝে খোঁচা দেবে। এতে করে মাল্টিটাস্কিং এর মতই মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়।

সবচেয়ে ভালো সমাধান হলো, একটি কাজ শেষে পরের কাজে যাওয়ার আগে কিছু সময়ের বিরতি নেয়া।

High Performance Habits: How Extraordinary People Become That Way” বইয়ের লেখক ব্রেন্ডন বারচার্ড এর মতে,

“বেশিরভাগ মানুষ আসলে একই দিনে বিভিন্ন পরিস্থিতির মাঝ দিয়ে যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে হাই পারফর্মাররা একটি কাজ থেকে আরেক কাজে যাওয়ার আগে ছোট ছোট ব্রেক নেন, যা তাঁদের পরের কাজের জন্য বেশ কিছুটা এনার্জি দেয়।
অনেকে নতুন কাজ শুরুর আগে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ধ্যান করে। এটি তাদের বিশ্রাম ও স্বস্তি দেয়। ফলে পরের কাজের জন্য নতুন করে এনার্জি পাওয়া যায়। হাই পারফর্মারা সারাদিন এই ছোট ছোট বিরতি নিয়ে নিজেদেরকে ‘রিচার্জ’ করে নেন “

(High Performance Habits এর পুরো বুক রিভিউটি এই লিংকে গিয়ে দেখতে পারেন)

দু’টি কাজের মাঝখানে সম্ভব হলে ২০ মিনিটের একটি ব্রেক নিন। সম্ভব না হলে ১০ মিনিট ব্রেক নেয়ার চেষ্টা করুন। এই সময়টিতে কোনও কাজের বিষয় চিন্তা করবেন না। মস্তিষ্ককে নিজের মত করে গুছিয়ে উঠতে দিন।

১১. ক্ষুদ্র বিনোদন

smartphone music headphones

আজকাল সবার কাছেই স্মার্টফোন আছে। আপনার স্মার্টফোন না থাকলেও আজকাল যে কোনও ফোনেই মিউজিক প্লেয়ার আছে। এটা বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমানিত যে মিউজিক দারুন ভাবে মানসিক চাপ দূর করে। আপনার প্রিয় কিছু গান দিয়ে একটি প্লে লিস্ট বানিয়ে মাঝে মাঝে শুনতে পারেন।

বিশেষ করে কাজের মাঝে যখন বিরতি নিচ্ছেন, তখন হেডফোন দিয়ে কথা বিহীন ইনস্ট্রুমেন্টাল শুনতে পারেন। এটা কাজের সময়ে আপনাকে চাঙ্গা রাখবে। এছাড়া কাজ থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে হেডফোনে প্রিয় মিউজিক শুনলে দারুন ভাবে ক্লান্তি দূর হয়। বাসায় দিয়ে এতটা দুর্বল লাগবে না।

মিউজিক এর বাইরেও দিনের কাজ শেষে কিছুক্ষণের জন্য গল্পের বই পড়া, বা অন্য ছোট ছোট বিনোদন মূলক কাজ আপনাকে চাঙ্গা থাকতে সাহায্য করবে।
তবে এটা অতিরিক্ত করবেন না, তাহলে সময় নষ্ট হবে।

পরিশিষ্ট:

১৯৭০ দশকে আর্ল নাইটেঙ্গেলকে বলা হতো পার্সোনাল ডেভলপমেন্টের গুরু। তাঁর মতে, যদি কেউ প্রতিদিন মাত্র ১ ঘন্টা একটি বিষয়ে পড়াশুনা করে, তবে ৫ বছরের কম সময়ে সে সেই বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ হতে পারবে।
আমাদের অনেকেরই নতুন নতুন বিষয় শেখার আগ্রহ আছে – কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তি আমাদের এমন ভাবে চেপে ধরে যে আমরা শেখার পেছনে আধা ঘন্টাও ব্যয় করতে পারি না। আপনি হয়তো চাকরির পাশাপাশি নিজের লেখা বই প্রকাশ করতে চান – কিন্তু দিন শেষে বই লেখার মুড বা এনার্জি থাকে না। কিন্তু সত্যি কথা হলো, আমাদের সত্যিকার কর্মক্ষমতা, আমাদের ভাবনার চেয়েও অনেক বেশি, প্রয়োজন শুধু কিছু এনার্জি বৃদ্ধি করার কৌশল অবলম্বন করা।

মনে রাখবেন, আমাদের সবারই প্রতিদিনের কাজের জন্য শরীরে একটি নির্দিষ্ট পরিমান এনার্জি জমা থাকে। নিয়ম করে চললে ধীরে ধীরে তা বাড়ে। কিন্তু তারচেয়ে বড় কথা, কিছু নিয়ম মেনে চললে যতটুকু জমা আছে তা দিয়েই আপনি এখনকার চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে পারবেন। আর সেই পথে এই লেখাটি যদি সামান্যও কাজে আসে, তাহলেই আমাদের প্রচেষ্টা সফল হবে।


লেখাটির ব্যাপারে আপনার মতামত কমেন্টের মাধ্যমে জানান। আপনার প্রতিটি মতামতই আমাদের কাছে মহামূল্যবান। যদি মনে হয় লেখাটির মাধ্যমে অন্যরাও উপকৃত হবেন, তবে শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন। আমাদের সাথে থাকুন। আপনার সাফল্যেই আমাদের সার্থকতা।

আপনার জন্য:

→ নিজের সীমাবদ্ধতাকে জয় করার উপায়: ৩টি দর্শন যা আপনার জীবনকে বদলে দিতে পারে

→ গুগলের আবিষ্কৃত পারফেক্ট টিম তৈরী করার ৫টি আদর্শ সূত্র

→ শত চাপের মাঝেও প্রোডাক্টিভ থাকবেন যেভাবে (বুক রিভিউ: “স্মার্টার ফাস্টার বেটার”)

→ সফল ও দক্ষ মানুষদের ৭টি কমন অভ্যাস যা আপনারও করা উচি‌ৎ

→ নিজেকে পজিটিভ রাখতে প্রতিদিন এই ৫টি কাজ করুন

পোস্টটি শেয়ার করুন !