ডেল কার্নেগী এর “হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস এ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল”–বুক রিভিউ


  • By
  • December 5th, 2018
  •    
  • পড়তে সময় লাগবে: 8 minutes
  • 5,776 views
হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস এ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল, ডেল কার্নেগী, বই

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের কর্মজীবনের সাফল্যের মাত্র ১৫% তার কাজের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে, আর বাকি ৮৫% নির্ভর করে তার যোগাযোগ দক্ষতা বা কমিউনিকেশন স্কিলের ওপর। এমনকি হাইলি টেকনিক্যাল ফিল্ড, যেমন ইন্জিনিয়ারিং বা এধরনের ফিল্ডগুলোতেও একই চিত্র।

আপনি যে পেশাতেই থাকুন, মানুষের সাথে ভালোমত কথা বলতে পারা, তাদের সাথে দ্রুত ভালো সম্পর্ক তৈরী করা ও তাদের দিয়ে নিজের কাজ করানোর দক্ষতার ওপরই আপনার বেশিরভাগ সাফল্য নির্ভর করে। আর আজ আমরা যোগাযোগ দক্ষতার ওপরে লেখা একটি বিখ্যাত মাস্টারপিস নিয়ে আলোচনা করব।

হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস এ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল (How to win friends and influence people) ডেল কার্নেগীর লেখা সবচেয়ে বিখ্যাত বই। ভুল বলা হলো, শুধু ডেল কার্নেগীর সবচেয়ে বিখ্যাত বই নয়, ১৯৩৬ সালে প্রকাশ হওয়া কমিউনিকেশন এ্যাডভাইস মাস্টারপিসটি পৃথিবীর মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত বইগুলোর একটি। এই বইয়ের প্রতিটি পরামর্শ ও যুক্তি বাস্তব জীবনে দারুন ভাবে কাজ করে। সেকারণেই প্রকাশ হওয়ার ৮২ বছর পরও বইটি আগের মতই জনপ্রিয় আছে। আধুনিক কালে কমিউনিকেশনের ওপর যতগুলো বেস্ট সেলিং বই বের হয়েছে, সেগুলো একটু হলেও ডেল কার্নেগীর এই মাস্টারপিস দ্বারা অনুপ্রাণিত।

হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস এ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল বইটিকে ধরা হয় ইন্টার পার্সোনাল কমিউনিকেশনের সবচেয়ে কার্যকর বই। ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে, প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত পর্যায়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই বইটির লিসনগুলো দারুন কাজে লাগে।

২৯১ পৃষ্ঠার বইটি এখন পর্যন্ত দেড় কোটির বেশি কপি বিক্রী হয়েছে, যা বইটিকে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রীত বইয়ের তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে।

এই বইটি থেকে আপনি শিখতে পারবেন কিভাবে মানুষের সাথে ভালো সম্পর্ক করা যায়, এবং যে কাউকে দিয়ে যে কোনও কাজ করিয়ে নেয়া যায়। বইটির শিক্ষাগুলো ঠিকমত কাজে লাগাতে পারলে, যে কোনও মানুষকে দিয়ে আপনার কাজটি করিয়ে নেয়ার ব্যাপারে আপনি অনেক দক্ষ হয়ে উঠবেন; এবং সেইসাথে যার সাথে প্রয়োজন, তার সাথেই খুব কম সময়ের মধ্যে একটি ভালো সম্পর্ক তৈরী করতে পারবেন।

বইটির কার্যকারিতা জানলেও আমাদের মধ্যে অনেকেই প্রায় ৩০০ পৃষ্ঠার এই বইটি পড়তে চেয়ে সময়ের অভাবে বা অন্য অনেক কারণে পড়তে পারেন না।

আর তাই আমরা বইটির মূল লিসনগুলো রিভিউ আকারে এই লেখায় যোগ করেছি, যাতে করে আপনি পুরো বইটি না পড়েও এর মূল শিক্ষাগুলো সম্পর্কে জানতে পারেন ও বাস্তব জীবনে কাজে লাগাতে পারেন।

হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস এ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল বুক রিভিউ:

হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস এ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল বইতে লেখক ডেল কার্নেগী ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে সাফল্যের জন্য কার্যকর কমিউনিকেশন স্কিল কিভাবে অর্জন করতে হয় – তা খুব সহজ ভাষায় সুন্দর করে শিখিয়েছেন। বইটিতে তিনি বেশ কিছু প্রিন্সিপাল বা নীতি শিখিয়েছেন, যেগুলো আমরা এই বুক রিভিউতে সংক্ষিপ্ত আকারে আপনাকে সেগুলো জানাবো।

০১. মানুষ যা চায়, তাকে তাই দিতে হয়

খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এগুলো মানুষের মৌলিক চাহিদা। এই মৌলিক চাহিদার বাইরে আরও একটি চাহিদা লেখক খুঁজে বের করেছেন – যা বেশিরভাগ মানুষই জানে না। আর তা হলো, অন্যের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এবং নিজের কাজের জন্য প্রশংসিত হওয়া। আপনি যদি কোনও মানুষকে সঠিকভাবে এটি দিতে পারেন – তবে সে আপনাকে অল্প সময়েই কাছের মানুষ ভাবার পাশাপাশি নিজের গরজেই আপনার কথামত চলবে।

মানুষের অনেক ছোট ছোট কাজকে আমরা প্রশংসা করতে ভুলে যাই। একজন মানুষ যদি আগ্রহ নিয়ে কিছু করে তাহলে সব সময়েই উচি‌ৎ সেই কাজকে গুরুত্ব দেয়া।

খেয়াল করলে হয়তো দেখবেন, ছোট ছোট পদে কাজ করা মানুষেরা সব সময়ে খিটখিটে মেজাজের হয়। একমাত্র যাদের সাথে তারা ভালো ব্যবহার করতে বাধ্য – শুধু তাদের সাথেই ভালো ব্যবহার করে। এদের এমন আচরণ করার প্রধান কারণই হলো এদের অবদানকে কেউ গুরুত্ব দেয় না। এবং তাদের কাজের প্রশংসাও করে না। তারা তখন নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য অকারণে খিটখিটে ও গম্ভীর ভাব নিয়ে থাকে।

অনেক সময়ে সংসারেও অশান্তি নেমে আসে মানুষের ছোট ছোট অবদানগুলোর প্রশংসা না করার জন্য।

আপনি যদি কারও কাছ থেকে কিছু চান, তাহলে আগে তাকে কিছু দিন। শুধুমাত্র মুখের কথা দিয়ে টাকার চেয়ে অনেক বেশি কাজ হতে পারে।

আপনি হয়তো আপনার টিম মেম্বারকে দিয়ে কিছু করাতে চাচ্ছেন – যা সে আপনার চাওয়ামত করছে না। তাকে জোর করে করানোর বদলে তার দক্ষতার প্রশংসা করুন, বলুন এই কাজে তারচেয়ে ভালো লোক আপনি দেখেননি এবং তার যে দক্ষতা, তাতে সে বর্তমানে যা করছে তারচেয়েও অনেক ভালো পারফর্মেন্স করতে পারবে। এরপর তাকে আপনার চাওয়াটি বলুন। এভাবে বলার দরকার নেই যে, আপনি ওভাবে চাচ্ছেন; তাকে বলুন তার ট্যালেন্টের জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো হবে। দেখবেন আপনার মত করে কাজ করতে সে আগের চেয়ে বেশি আন্তরিক হয়ে উঠেছে।

আপনার কাছে এসে যদি কেউ নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে পারে তবে সে আপনার জন্য যে কোনওকিছু করতে পারবে।

০২. মানুষ যেন নিজেই আপনার কাজটি করতে চায়

একজন মানুষ যতক্ষণ নিজে না চাইবে, ততক্ষণ আপনি তাকে দিয়ে কোনও কাজ করাতে পারবেন না। হয়তো ভয় দেখিয়ে ও জোর করে আপনি তাকে দিয়ে কাজ আদায় করতে পারবেন। তবে সেই দায়সারা কাজ কোনওভাবেই ভালো হবে না, ফলে আপনার তেমন কোনও উপকারও হবে না।

ডেল কার্নেগী নিউ ইয়র্কের একটি হোটেলে বেশ কিছু লেকচার দিয়েছিলেন। মানুষ অনেক টাকা দিয়ে তাঁর কথা শুনতে আসতো। এরকমই একটি লেকচারের আগে তিনি জানতে পারলেন, হোটেল কতৃপক্ষ এবার আগের চেয়ে ৩গুণ ভাড়া বেশি চাইছে।

কার্নেগী যখন এই খবর পেলেন, ততক্ষণে তাঁর প্রোগ্রামের সব টিকেট বিক্রী হয়ে গেছে। এবং তিনি এত ভাড়া দিতে চাইছিলেন না।

তিনি পরদিন নিজেই হোটেলে গিয়ে ম্যানেজারের সাথে দেখা করলেন। এবং বললেন, “আপনার চিঠি পড়ে আমি বেশ অবাক হয়েছি। কিন্তু আমি আপনার ওপর মোটেই বিরক্ত হইনি। আপনার কাজই হলো হোটেলের জন্য বেশি লাভ নিয়ে আসা। আপনার জায়গায় থাকলে আমিও বোধহয় এটাই করতাম। আমি বলছি না যে আমার জন্য আপনি ভাড়া কমান। আমি আপনাকে শুধু কিছু জিনিস লিখে দিতে চাই।”

এরপর কার্নেগী কাগজ কলম নিয়ে এক পাশে তাঁকে ভাড়া দিলে কি লাভ হবে, এবং অন্য পাশে তাঁকে না দিলে কি লোকসান হবে সেগুলো খুব সুন্দর করে গুছিয়ে লিখলেন।

তিনি লিখেছিলেন:আমাকে যদি না দেন, তবে আপনার হোটেলের বল রুম ফ্রি হয়ে যাবে। যা আপনি ডান্স পার্টি বা অন্য কোনও ইভেন্টের জন্য ভাড়া দিতে পারবেন। এবং এগুলো থেকে অবশ্যই আপনার লাভ হবে।”

অন্যদিকে আপনি আমার কাছ থেকে যা পেতেন – তার কিছুই পাবেন না, কারণ এত টাকা দিয়ে বলরুম ভাড়া নেয়ার মত সামর্থ্য আমার নেই, কাজেই আমাকে অন্য জায়গা ভাড়া করতে হবে। আর একটা ব্যাপার, আমার লেকচার শুনতে শিক্ষিত ও টাকাওয়ালা লোকেরা আসেন। এবং তাঁরা আমার লেকচারের কথার পাশাপাশি আপনার হোটেলের নামও প্রচার করেন। আপনি বিজ্ঞাপনের পেছনে ৫০০০ ডলার খরচ করেও এত লোক আনতে পারবেন না, যত লোক আমার লেকচার শুনতে আসে।”

এরকম বেশকিছু তুলনা লেখার পর কার্নেগী ম্যানেজারকে কাগজটি দিয়ে চলে আসলেন। আসার আগে ম্যানেজারকে আরেকটু ভেবে সিদ্ধান্তটি নিতে অনুরোধ করলেন। পরদিনই ম্যানেজার কার্নেগীর কাছে খবর পাঠালো যে, ৩ গুণ ভাড়া তাঁকে দিতে হবে না।

এই কাজটি আদায় করার সময়ে কার্নেগী একবারও ম্যানেজারকে নিজের প্রয়োজনের কথা বলেননি। টিকেট বিক্রী হয়ে গেছে, এখন তাঁর পক্ষে অনুষ্ঠানের জায়গা বদলানো সম্ভব নয় – এসব বললে ম্যানেজার তাঁকে আরও পেয়ে বসতো। কিন্তু তিনি নিজের কথা না বলে ম্যানেজারের কিসে লাভলোকসান হবে, সেটাই শুধু বলেছেন।

কার্নেগীর জায়গায় অন্যকেউ হলে হয় ম্যানেজারের কাছে গিয়ে শেষ সময়ে ভাড়া বাড়ানোর জন্য ধমকা ধমকি করতো; অথবা নিজের অসুবিধার কথা বলে অনুনয় বিনয় করে ভাড়া কমানোর অনুরোধ করতো। আবার যদি যুক্তি দিয়ে ম্যানেজারকে ভুল প্রমাণ করাতো, তবুও ম্যানেজার নিজের রেট কমাতো না। কারণ নিজের ইগো জয় করে ভুল স্বীকার করে তা শুধরানোর মত মানুষ পৃথিবীতে খুবই কম।

বইয়ের শুরুর দিকে কার্নেগী একটি গল্প বলেছেন। একটি কন্সট্রাকশন সাইটের কর্মীদের কাজের সময়ে হেলমেট পরার নির্দেশ থাকলেও তারা তা পরতে চাইতো না। ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ভাবে ধমক ধামক দিয়ে তাদের হেলমেট পরানো হলেও, সুযোগ পেলেই তারা তা খুলে ফেলতো। আইন মানতে চাইতো না।

এরপর একজন একটু অন্যভাবে চেষ্টা করলেন। তিনি আইন, নিয়ম – এসব নিয়ে কথা না বলে, খুব সুন্দর ভাবে, আন্তরিকতার সাথে শ্রমিকদের হেলমেট না পরলে তাদের কি কি ক্ষতি হতে পারে তা বোঝালেন। কন্সট্রাকশন সাইটে যে কোনও সময়ে ওপর থেকে যে কোনও কিছু পড়তে পারে মাথায় হেলমেট না থাকলে আহত হওয়ার সম্ভাবনা আছে এরকম কথা সহ আরও ভালো ভালো কথা বললেন। মোটকথা শ্রমিকদের বোঝালেন যে তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্যই হেলমেট পরে কাজ করা উচি‌ৎ। এরপর দেখা গেল শ্রমিকরা নিজেরাই হেলমেট পরে কাজ করছে। যারা পরছে না অন্য শ্রমিকরা তাদের হেলমেট পরতে বলছে!

আপনি যদি কাউকে দিয়ে কিছু করিয়ে নিতে চান, তবে আপনার লাভলসের বদলে তার এতে কি লাভ বা লস হবে সেটার ওপর ফোকাস করুন। এই পদ্ধতিতে কাজ করলে মানুষ নিজের লাভের জন্যই আপনার কাজটি করতে চাইবে। মানুষকে যদি আপনার কাজের ভেতর তার নিজের লাভটি দেখিয়ে দিতে পারেন, তবে সে নিজে থেকেই আপনার কাজটি করে দেবে এবং সে তা অনেক বেশি আন্তরিক ভাবে করবে।

০৩. যোগাযোগের সময়ে নিজের চেয়ে অন্যের ওপর বেশি ফোকাস করুন

প্রতিটি মানুষের কাছে তার নিজের জীবনটি একটি সিনেমা, যার নায়ক/নায়িকা সে নিজে।

বেশিরভাগ মানুষ অন্যের কাছে পছন্দনীয় হওয়ার জন্য নিজের ব্যাপারে ভালো ভালো ও বড় বড় কথা বলে। আর যারা এটা করে না, তারাও নিজের সাথে সম্পর্কিত কথাই বেশি বলে। তাদের মনে হয়, নিজের ব্যাপারে কথা বললে সামনের মানুষটি ইমপ্রেসড হয়ে যাবে।

কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। পৃথিবীর কোনও মানুষই চায় না যে সামনের মানুষটি তারচেয়ে ভালো হোক। যখন আপনি তার সামনে তারচেয়ে ভালো হিসেবে নিজেকে তুলে ধরবেন, তখন সে নিজের অজান্তেই আপনাকে অপছন্দ করা শুরু করবে। মুখে এটা কেউ স্বীকার করে না, কিন্তু বাস্তবতা এটাই।

কাজেই, আপনি যদি কারও সাথে অল্প সময়ে বা প্রথম দেখায় ভালো সম্পর্ক করতে চান, তবে তাকে তার কথা বলার জন্য বেশি সুযোগ দিন। তার ব্যাপারে আগ্রহ দেখান। সে যখন নিজের কথা বলতে পারবে তখন সে নিজেই একটা পর্যায়ে আপনার ব্যাপারে জানতে আগ্রহী হয়ে উঠবে।

এখানে একটা হিসাবও আছে, আপনি যদি কারও সাথে কথা বলে খাতির করতে চান, তবে ২৫% কথা শুধু আপনি বলবেন, এবং বাকি ৭৫% অন্য মানুষটিকে বলতে দেবেন।

যার কাছে মানুষ নিজের কথা বলতে পারে, তাকেই মানুষ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে।

একবার একটি আমেরিকান ফোন কোম্পানী দারুন এক ঝামেলায় পড়ল। তাদের এক গ্রাহক তার বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে কোম্পানীর লোকদের রাতের ঘুম হারাম করে দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পত্রিকায় কোম্পানীর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে শুরু করলো। এক পর্যায়ে গিয়ে মামলাও করে দিলো। তার ওপরে তার অনেক টাকা বকেয়া বিলও সে পরিশোধ করেনি। লোকটিকে কোনওভাবেই বাগে আনতে না পেরে ল্যারি নামে এক লোককে নিয়োগ দিল লোকটিকে সামলানোর জন্য। ল্যারি ছিলেন ডেল কার্নেগীর ছাত্র। তিনি লোকটির সাথে মোট ৪বার সাক্ষা‌ৎ করেন, এবং প্রথমবার নিজের প্রসঙ্গে একটি কথাও না বলে তিনি টানা ৩ ঘন্টা ধরে সেই লোকের অভিযোগ শোনেন!

পরের মিটিংগুলোতেও তিনি ধৈর্য ধরে সেই লোকের কথা শোনেন। ধীরে ধীরে লোকটি তার সব অভিযোগের কথা ল্যারিকে শোনায়। ল্যারি কোম্পানীর পক্ষে একটি কথাও না বলে লোকটির সব কথা মেনে নেন। এভাবে চলতে চলতে এক সময়ে ল্যারির সাথে লোকটির একটি ভালো সম্পর্ক হয়ে যায়। এবং এক পর্যায়ে সে নিজেই তার সমস্ত অভিযোগ তুলে নেয়, এমনকি ফোনের বকেয়া বিলও পরিশোধ করে দেয়।

লোকটির এই ব্যবহারের কারণ ল্যারি খুব ভালোকরে বুঝতে পেরেছিলেন। লোকটির কথা কেউ শুনছিলোনা এবং গুরুত্ব দিচ্ছিলনা বলেই সে আসলে কোম্পানীর পেছনে লেগেছিল। সে যখন দেখল যে কোম্পানীর একজন প্রতিনিধি তার সব কথা মন দিয়ে শুনছে, ও মেনে নিচ্ছে, তার মেজাজ এমনিতেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল।

ল্যারি যদি প্রথমেই লোকটিকে ভুল প্রমাণ করতে চাইতেন এবং তাকে কৌশল খাটিয়ে থামাতে চাইতেন – তবে ভালোর চেয়ে খারাপই বেশি হত। বেশিরভাগ মানুষের কাছে দুর্ভিক্ষে বা যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ মারা যাওয়ার চেয়ে নিজের দাঁতের ব্যাথার গুরুত্বই বেশি।

মানুষ আসলে তার নিজের কথা শোনাতে চায়। আর যে তার কথা মন দিয়ে শুনবে ও মূল্য দেবে, তাকেই সে আপন করে নেবে।

কাজেই, কাউকে নিজের কথা শোনানোর আগে তার কথা আগে শুনুন, তাহলেই তাড়াতাড়ি তার সাথে সম্পর্ক করতে পারবেন।

এই প্রসঙ্গে লেখক তাঁর বইয়ে লিখেছেন: “অন্যদের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়ে তুমি ২ মাসে যত বন্ধু বানাতে পারবে নিজের ব্যাপারে কথা বলে ২ বছরেও তত বন্ধু বানাতে পারবে না”

যোগাযোগের ক্ষেত্রে সব সময়ে সামনের মানুষটির ওপর বেশি ফোকাস করার চেষ্টা করুন। এবং এমন ভাবে ফোকাস করুন, যাতে সে বুঝতে পারে আপনি আসলেই তার ব্যাপারে জানতে আগ্রহী।

০৪. মানুষের নাম তার কাছে অনেক প্রিয়, এটাকে কাজে লাগান

মানুষের নাম তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলোর একটি। ডেল কার্নেগীর মতে, কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে নামকে ব্যবহার করে অনেক কাজ হাসিল করা সম্ভব।

বিলিওনেয়ার এ্যান্ড্রু কার্নেগীকে ধরা হয় স্টিল বিজনেসের রাজা। তিনি এতই গরিব ছিলেন যে ১২ বছর বয়সে মলিন ও নোংরা পোশাকের জন্য পার্ক থেকে বের করে দেয়া হয়েছিলো। তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, একদিন ঐ পার্কের মালিক হবেন তিনি। ৪২ বছর বয়সে তিনি সেই পার্কটিই কিনে ফেলেন এবং সবার জন্য মুক্ত করে দেন। তাঁর মোট সম্পদ ছিলো আজকের দিনের ৩১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

এই এ্যান্ড্রু কার্নেগী কিন্তু খুব বেশি প্রতিভাবান ছিলেন না। স্টিভ জবস, টমাস আলভা এডিসন বা ইলন মাস্ক এর মত তুখোড় টেকনিশিয়ান ও উদ্ভাবক ছিলেন না তিনি ছিলেন যোগাযোগে দারুন দক্ষ। বিশেষ করে মানুষের নামকে ব্যবহার করে তাদের দিয়ে দারুন ভাবে কাজ আদায় করতে পারতেন তিনি।

[ এ্যান্ড্রু কার্নেগী ]
ছোটবেলায় একবার তিনি বাড়িতে একটি মাদি খরগোশ নিয়ে আসেন। কয়েকদিন পর খরগোশটি বেশ কয়েকটি বাচ্চা দেয়। কিন্তু এতগুলো খরগোশকে খাওয়ানোর মত খাবার তিনি একা যোগাড় করতে পারতেন না। ভাবতে ভাবতে তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি এল। তিনি প্রতিবেশী বাচ্চাদের ডেকে বললেন, তারা যদি খরগোশগুলোর জন্য খাবার যোগাড় করে, তবে তিনি তাদের এক একজনের নামে খরগোশের এক একটি বাচ্চার নাম রাখবেন। এই শুনে সবাই মহা খুশি হয়ে প্রতিদিন খরগোশের জন্য খাবার এনেছিল।

এ্যান্ড্রু এই অভিজ্ঞতা বিলিয়ন ডলার বিজনেস ডিল পাওয়ার জন্যও কাজে লাগিয়েছিলেন!

আমেরিকার পেনসিলভেনিয়া রেলরোড তৈরীর সময়ে এ্যান্ড্রু কার্নেগী স্টিল সাপ্লাই করার কাজটি পাওয়ার জন্য অনেক তদবির করেও কাজটি পাচ্ছিলেন না। বেশকিছুদিন কোনও বুদ্ধি বের করতে না পেরে হঠা‌ৎ করেই তাঁর ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়।

তিনি নতুন একটি স্টিল কারখানা খুলে সেটির নাম দিলেন “এডগার থম্পসন স্টিল ওয়ার্কস” কারণ পেনসিলভেনিয়া রেলরোড প্রজেক্টের প্রেসিডেন্ট। তিনি যখন দেখলেন তাঁর নিজের নামের একটি কোম্পানী কাজটি করতে চাচ্ছে তিনি আর কোনও চিন্তা না করে এ্যান্ড্রুর কোম্পানীকে কাজটি দিয়ে দিলেন।

আরেকবার ইউনিয়ন প্যাসিফিক রেলরোড এর জন্য রেলগাড়ি বানানোর কাজ পাওয়ার জন্য এ্যান্ড্রু কার্নেগীর সাথে জর্জ পোলম্যানের মাঝে তুমুল প্রতিযোগীতা শুরু হলো। কাজ পাওয়ার জন্য দু’জনেই তাদের পন্যের দাম এত কমিয়ে দিচ্ছিলেন যে তাঁদের কারওই তেমন লাভ থাকছিল না।

এ্যান্ড্রু একদিন পোলম্যানের সাথে দেখা করে সবকিছু বুঝিয়ে বললেন। তিনি পোলম্যানকে বোঝালেন যে প্রতিযোগীতা করার চেয়ে একসাথে ব্যবসা করলে লাভ বেশি হবে। পোলম্যান সব কথা শুনলেন কিন্তু তাঁর তখনও রাজি হওয়ার মত কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল না। তিনি চিন্তিত ভাবে বললেন, “ধরো আমরা একসাথে একটি কোম্পানী করলাম, কিন্তু তার নাম কি হবে?” – এ্যান্ড্রু কার্নেগী এক মূহুর্ত দেরি না করে বললেন: অবশ্যই কোম্পানীর নাম হবে ‘পোলম্যান প্যালেস কার কোম্পানী’!”

এই কথা শোনা মাত্রই জর্জ পোলম্যানের মুখে হাসি ফুটল। এবং তিনি এই ব্যাপারে আরও কথা বলার জন্য কার্নেগীকে নিজের অফিসে দাওয়াত করলেন। পরে তাঁরা স্টিল ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুক্তিগুলোর মধ্যে একটি করেছিলেন।

আগেরকার দিনে ধনী ব্যক্তিরা লেখকদের টাকা দিতেন যাতে লেখকরা নিজের বইয়ে তাদের নাম লেখেন। আজকাল অনেকেই নিজের বা প্রিয়জনের নামে হাসপাতাল, স্কুল – ইত্যাদি বানায় – যাতে যুগ যুগ ধরে তার নামটি মানুষ মনে রাখে। মানুষের নাম তার কাছে এতই প্রিয়। এবং এই প্রিয় জিনিসটি কাজে লাগিয়ে আপনি তার সাথে দারুন একটি সম্পর্ক তৈরী করতে পারবেন।

কথা বলার সময়ে কিছুক্ষণ পর পর সামনের মানুষটির নাম উচ্চারণ করা, মানুষের নাম মনে রাখা ইত্যাদি ছোট ছোট বিষয় আপনাকে সম্পর্ক তৈরীর ক্ষেত্রে দারুন সাহায্য করবে।

০৫. অন্যের আগ্রহের জায়গা খুঁজে বের করুন

৩ নম্বর পয়েন্টে অন্যের ওপর ফোকাস করার কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, মানুষকে তার নিজের কথা বলতে দেয়ার জন্য। এই ব্যাপারটি যদি সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে চান, তবে ডেল কার্নেগীর উপদেশ হলো, অন্যের সবচেয়ে আগ্রহের জায়গাটি খুঁজে বের করুন। সেটা নিয়ে তার সাথে কথা বলুন। সে অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে আপনার সাথে কথা বলবে।

কারও যদি টেকনোলজির প্রতি আগ্রহ থাকে, তবে তার সাথে টেকনোলজি নিয়ে কথা বলুন। আপনাকে টেকনোলজি সম্পর্কে জানতে হবে না, তাকে জিজ্ঞাসা করুন। তার কাছ থেকে শেখার আগ্রহ প্রকাশ করুন। দেখবেন সে নিজের আগ্রহেই আপনার সাথে কথা বলছে এবং তারপর আপনি তাকে যা বলবেন সে সেটাই আগ্রহের সাথে করবে।

বইয়ে ডেল কার্নেগী এডওয়ার্ড ক্যালিফ নামে বয় স্কাউটের একজন লিজেন্ডের কথা বলেছেন। তিনি ছিলেন বয় স্কাউটের একজন ট্রেইনার, এবং তাঁর সময়ে তিনি সবচেয়ে কম বয়সে স্কাউটের সবচেয়ে সম্মানজনক ব্যাজ, ‘ঈগল ব্যাজ’ জিতেছিলেন। একবার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বয় স্কাউট সম্মেলন ইউরোপে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। ক্যালিফ চাইছিলেন তাঁর গ্রুপের অন্তত একটি ছেলে সেই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করুক। কিন্তু তাঁদের হাতে এত টাকা ছিল না। তাই ক্যালিফ ফান্ড যোগাড়ের আশায় একজন ধনী ব্যবসায়ীর কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

যাওয়ার আগে সেই ব্যবসায়ীর ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে গিয়ে তিনি জানতে পারলেন, লোকটি একবার ১ মিলিয়ন ডলারের একটি চেক লিখেছিল, চেকটি বাতিল হওয়ার পর তিনি সেটি ফ্রেমে বাঁধিয়ে রেখেছিলেন। ১৯২০৩০ এর দশকে ১ মিলিয়ন ডলার মানে আজকের ১০ মিলিয়ন বা এক কোটি ডলারেরও বেশি। এবং সেই সময়ে এটা আসলেই বিশাল ঘটনা ছিল, এবং ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখার মানে, ব্যবসায়ীটি সেই ব্যাপারে গর্বিত ছিলেন।

ক্যালিফ সেই ব্যবসায়ীর এ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে তাঁর কাছে গেলেন এবং নিজের ব্যাপারে একটি কথাও না বলে সেই চেকের ব্যাপারে কথা বলতে শুরু করলেন এবং চেকটি দেখতে চাইলেন। ব্যবসায়ী খুব খুশি হয়ে তাঁকে সেই চেক দেখালেন। এরপর তাঁরা চেক, টাকা নিয়ে কথা বলতে লাগলেন – যা আসলে ব্যবসায়ীর আগ্রহের বিষয়। অনেক্ষণ কথা বলার পর ব্যবসায়ীটিই ক্যালিফকে জিজ্ঞাসা করলেন যে তিনি কেন এসেছেন। ক্যালিফ এবার তাঁর স্কাউট ও ফান্ডের কথা বললেন, এবং ব্যবসায়ীটি খুশি মনে, একজনের বদলে ক্যালিফ সহ ৬ জনের ৭ সপ্তাহ প্যারিসে থাকার ফান্ড দিয়ে দিলেন! এমনকি তিনি সেখানে নিজের প্রতিনিধির নম্বর দিয়ে দিলেন যাতে স্কাউটদের কোনও সমস্যা না হয়। সফরের শেষ দিকে তিনি নিজে গিয়ে স্কাউটদের প্যারিস ঘুরে দেখান।

ক্যালিফ পরে বলেছিলেন, এর সবই সম্ভব হয়েছিল, কারণ তিনি ব্যবসায়ী লোকটির মূল আগ্রহের জায়গাটি ধরতে পেরেছিলেন।

আপনিও যদি কারও সাথে কথা বলার আগে, বা কথা বলার মাঝে তার সবচেয়ে আগ্রহের বিষয়টি বুঝে সেই ব্যাপারে কথা বলতে পারেন – তবে আপনিও সম্ভবত তার কাছ থেকে এমন কিছু আদায় করতে পারবেন – সাধারণ অবস্থায় যা কল্পনাও করা যায় না।

০৬. অপর পক্ষকে ভাবতে দিন যে সিদ্ধান্তটি সেই নিচ্ছে

খুব সহজ একটি উদাহরণ দেয়া যাক, ধরুন আপনি নতুন বিয়ে করেছেন। আপনার প্রিয় রঙ নীল আর হলুদ। আপনার স্ত্রী/স্বামীর সাথে যখন জানালায় কি রঙের পর্দা দেবেন সেই ব্যাপারে আলোচনা করছেন, তাকে আপনি বললেন যে আপনার প্রিয় রঙ নীল বা হলুদ রঙের পর্দা জানালায় দিতে হবে।

এই কথা বললে অপর পক্ষেরও তার নিজের প্রিয় রঙের কথা মনে পড়ে যাবে। এবং সেটা যদি আপনার সাথে না মেলে তাহলে কিন্তু সমস্যা। বাধ্য হয়ে সে যদি মেনেও নেয়, তবুও তার মাঝে একটা আফসোস থেকে যাবে।

এসব ক্ষেত্রে যদি আপনি একটু অন্যভাবে কথাটা বলেন – তাহলেই কিন্তু এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। নিজের পছন্দের কথা বলার বদলে আপনি বলতে পারেন, “আচ্ছা, জানালায় হলুদ পর্দা দেব, না নীল পর্দা? – কোনটা দিলে ভালো হয় বলতো?” – এভাবে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা যদি অপর পক্ষের হাতে ছেড়ে দেন, তবে ১০০ তে ৯০ বারের বেশি সে আপনার দেয়া অপশনের থেকেই একটি বেছে নেবে। সে ভাববে সিদ্ধান্তটা সে নিচ্ছে, কিন্তু আসলে সে আপনার পাতা জালেই ধরা পড়েছে।

এভাবে যে কোনও ক্ষেত্রেই আপনি অন্যকে দিয়ে নিজের কাজটা করিয়ে নিতে পারেন। তবে এই ক্ষেত্রে অভিনয়টা খুব ভালো হতে হবে। এমন একটা ভাব দেখাবেন যে আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না, এবং তার সাহায্য আপনার খুবই প্রয়োজন।

টিমের কাজের ক্ষেত্রেও এরকম a/b অপশন অন্যদের সামনে তুলে ধরলে অন্যরা আপনার দেয়া অপশন থেকে একটি বেছে নেবে এটাই স্বাভাবিক।

বেশিরভাগ মানুষ যখন দেখে যে কেউ তাকে সুপিরিয়রিটি বা গুরুত্ব দিচ্ছে – তখন সে সেই খুশিতে অনেক কিছু চিন্তা না করেই আপনার কথামত কাজ করবে।

০৭. অহেতুক বিতর্ক এড়িয়ে চলুন

ডেল কার্নেগীর বইটির মূল কথাই আসলে অন্যকে ভালো বোধ করানোর মাধ্যমে নিজেকে তার কাছে পছন্দনীয় করে তোলা।

আর একজন মানুষকে ছোট বা খারাপ বোধ করানোর জন্য তার সাথে বিতর্কে যাওয়া এবং বিতর্কে তাকে হারিয়ে দেয়ার চেয়ে ভালো কোনও উপায় নেই।

আপনি যার সাথেই বিতর্কে জড়াবেন, বা যাকেই বিতর্কে হারিয়ে দেবেন – সেই আপনাকে এড়িয়ে চলতে চাইবে।

খেয়াল করলে দেখবেন, কিছু বিশেষ মতাদর্শী লোককে কেউ পছন্দ করে না। সবাই তাদের এড়িয়ে চলতে চায়। এর পেছনে কিন্তু তাদের মতাদর্শ দায়ী নয়। এরা আসলে সব সময়ে বিতর্কের মাধ্যমে অন্যের বিশ্বাস ও যুক্তিকে খাটো করতে চায় বলে এদের কেউ পছন্দ করে না।

আপনি যদি কারও কাছে পছন্দনীয় হতে চান, তবে সবার প্রথমে তার সাথে সব রকমের বিতর্ক এড়িয়ে চলুন। আর কোনওভাবে যদি মতবিরোধ দেখা দেয় – তবে তাকে জিততে দিন। তবে এমন ভাবে জিততে দেবেন না যাতে সে বুঝতে পারে, আপনি ইচ্ছে করে তাকে জিততে দিচ্ছেন। এমন ভাবে বিতর্কের শেষ করুন যাতে করে সামনের মানুষটি বুঝতে পারে যে সে তার যুক্তি আর জ্ঞান দিয়েই আপনাকে চুপ করিয়ে দিয়েছে।

এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, তার যুক্তিগুলো কিভাবে আপনার মতামত বদলে দিয়েছে তা ব্যাখ্যা করা। আপনি ভাবতেও পারবেন না মানুষ এতে কতটা খুশি হয়। অনেক পুরনো বন্ধুর চেয়েও সে আপনাকে আপন ভাবতে শুরু করবে। এমনকি এমন কথাও বলবে যে এতদিন পর সে একজন মনের মত মানুষ পেয়েছে।

কাজেই, ভয়াবহ রকমের সিরিয়াস কোনও বিষয় না হলে, কখনওই বিতর্কে জড়াবেন না। তাহলেই দেখবেন অনেক মানুষের সাথে আপনার খুব সহজেই ভালো সম্পর্ক হয়ে যাচ্ছে।

০৮. ছাড় দিন: সব সময়ে জেতার চেষ্টা করবেন না

ইংরেজীতে “মিউচুয়াল বেনিফিট” এবং “উইনউইন” বলে দু’টি কথা আছে। দু’টি কথার মূল অর্থ মোটামুটি এক। শুধু নিজে জেতার বদলে যদি নিজের পাশাপাশি অন্যকেও জেতাতে পারেন – তবে দুই দিক দিয়েই আপনার লাভ।

প্রথমত, আপনি জিতলেন; আর দ্বিতীয়ত, অন্যকে জিততে দেয়ার ফলে, সম্পর্কের জায়গাটিও ঠিক থাকল।

এ্যান্ড্রু কার্নেগীর গল্পটিতে আবার ফিরে যাই। তিনি জর্জ পোলম্যানকে নামের ব্যাপারে ছাড় দিয়ে বিশাল একটা ব্যবসায়িক ডিল জিতে নিয়েছিলেন।

সব সময়েই যদি নিজে জিততে চান, এবং সব সময়েই যদি আপনার মতামতই খাটাতে চান – তবে কিছুদিন পর কেউই আর আপনার কথা শুনতে চাইবে না, এবং আপনাকে এড়িয়ে যেতে চাইবে। মানুষকে ছোট ছোট ব্যাপারে ছাড় দেবেন, সম্ভব হলে বড় ব্যাপারেও ছাড় দেবেন। তাহলে আপনার প্রতি অন্যদের একটা ভালো ধারণা তৈরী হবে, এবং আপনার প্রয়োজনে আপনাকেও তারা ছাড় দেবে।

নিজেকে জেদী এবং গোঁয়ার টাইপের মানুষের বদলে একজন উদার মানুষ হিসেবে অন্যের সামনে তুলে ধরুন। তারাও আপনার প্রতি উদারতা দেখাবে। কিছু মানুষ মানসিক ভাবে অসুস্থ এবং তাদের ইগো অনেক বেশি, তারা কোনও ভাবেই ছাড় দিতে চায় না। এই ধরনের মানুষকে কেউ পছন্দ করে না, এবং এদের ছাড় দিতে দিতে অতিষ্ঠ হয়ে এক পর্যায়ে ছাড় দেয়াই বন্ধ করে দেয়। আপনার মাঝে যদি এই ধরনের সমস্যা থাকে, তবে ইগো থেকে বাঁচতে করনীয় বিষয়ে আমাদের লেখাটি পড়তে পারেন।

শেষ কথা:

ডেল কার্নেগীর বইটি প্রায় ১০০ বছর ধরে মানুষকে কমিউনিকেশন শেখাচ্ছে। এর শিক্ষাগুলো প্রয়োগ করে বহু মানুষ তাদের জীবনের গল্পই বদলে ফেলেছে। আমরা আশা করি আমাদের এই ছোট প্রচেষ্টাও আপনাকে সামান্য হলেও সাহায্য করবে।

এই লেখা থেকে যদি আপনি কিছু শিখে থাকেন, তাহলে তা আমাদের কমেন্ট করে জানান। যদি কিছু বাদ পড়ে থাকে সেটাও জানান, যাতে পরের এডিটে আমরা তা যোগ করতে পারি।

আর যদি মনে হয় এই লেখা পড়ে অন্যরাও উপকৃত হবে, তবে শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন।

এমন আরও লেখার জন্য নিয়মিত আমাদের সাথে থাকুন। সাফল্যের পথে লড়াকু সব সময়ে আপনার সাথে আছে।

4 thoughts on “ডেল কার্নেগী এর “হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস এ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল”–বুক রিভিউ

  1. Pingback: - লড়াকু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *