সময়, টাকা ও জীবন নষ্ট করার ভয়ানক অস্ত্র “ফমো মার্কেটিং” : বাঁচার উপায় কি?


  • By
  • March 7th, 2019
  •    
  • পড়তে সময় লাগবে: 6 minutes
  • 3,431 views

মনে করুন, আজ বৃহস্পতি বার। এই সপ্তাহের পুরোটা কাজ/পড়াশুনা নিয়ে দারুন ধকল গেছে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে মনে হচ্ছে এক্ষুনি শুয়ে পড়তে। কালকের পুরো দিনটাও ঘুমানোর প্ল্যান আপনার। কিন্তু হঠাৎ করেই বন্ধুর ফোন এল, তারা সবাই মিলে সিনেমা দেখার ও একসাথে খাওয়ার প্ল্যান করেছে।

যদিও আপনার ভয়ানক ক্লান্ত লাগছে – কিন্তু আপনি তাকে দু’টি কারণে ’না’ বললেন না। এক, বন্ধুরা আপনার ওপর মাইন্ড করতে পারে; দুই, না গেলে হয়তো দারুন মজা মিস করবেন এবং পরে যখন বন্ধুদের ফেসবুক পোস্ট দেখবেন, এবং এই রাতের গল্প শুনবেন – তখন আপনার খারাপ লাগবে।

বন্ধুদের কাছে নিজের ইমেজ এবং মজা – এই দু’টি জিনিস হারানোর ভয়ে আপনি ভয়ানক ক্লান্ত হওয়ার পরও আপনি গেলেন।

ফলাফল, দরকার মত রেস্ট নিতে না পারায় আপনি পরের সপ্তাহের জন্য রিচার্জ হতে পারলেন না, এবং কাজ/পড়াশুনায় আপনার পারফর্মেন্স খারাপ হল।

অথবা ধরুন, চা-পাতা কিনতে সুপারশপে গেলেন। মাসের শেষে আপনার হাতে বেশি টাকা নেই, ভেবেছিলেন ছোট্ট একটা ১০০ গ্রামের প্যাকেট কিনবেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারলেন, ৫০০ গ্রামের দু’টো প্যাকেট কিনলে ২৫০ গ্রামের একটি ফ্রি পাবেন। প্রয়োজন না থাকার পরও আপনি বাড়তি ২৫০ গ্রামের জন্য ১০০ গ্রামের বদলে ১ কেজি চা পাতা কিনলেন।

ফলাফল, আপনার পকেটের টাকায় টান পড়ল, এবং দেখলেন চায়ের মেয়াদ আছে আর মাত্র এক মাস – এই সময়ে এত চা খেয়ে শেষ করতে পারবেন না। যার ফলে, চা গুলো হয় নষ্ট হবে, অথবা কাউকে দিয়ে দিতে হবে।

কিন্ত  কেন আমরা ক্ষতি হবে বা প্রয়োজন নেই জানার পরও কোনওকিছুতে অংশ নেই?

 ”FOMO” – একটি ফাঁদ

FOMO বা Fear Of Missing Out – টার্মটি সাইকোলজি ও মার্কেটিং এ একটি পরিচিত টার্ম। সোজা বাংলায় এর মানে হল ‘আফসোসের ভয়’। এটা মানুষের একটি সহজাত স্বভাব। মানুষকে এই ফাঁদে ফেলে লেখক থেকে শুরু করে কোম্পানী, সোশ্যাল মিডিয়া – সবাই ব্যবসা করছে।

কোনও কাজ না করলে আপনি কি হারাবেন, অথবা একটি নির্দিষ্ট প্রোডাক্ট না কিনলে কি মিস করবেন – এই ভয়ই মানুষকে অপ্রয়োজনীয় কাজ করতে বা পন্য কিনতে বাধ্য করে।

মানুষ জানে যে একটি লটারির একটি পুরস্কারের বিপরীতে লক্ষ লক্ষ টিকেট ছাড়া হয়। এবং তার জেতার চান্স লক্ষে মাত্র এক। কিন্তু তারপরও মানুষ টিকেট কেনে কারণ তাদের মনে হয় – হয়তো এটা আমার ভাগ্যেই আছে – না কিনলে সুযোগ মিস হয়ে যাবে।

এটি আসলে একটি ফাঁদ। ইন্টারনেট ভিত্তিক মিডিয়া পাবলিকেশন  স্লিকনোট এর চিফ মার্কেটিং অফিসার এমিল ক্রিস্টেনসিন বলেন – সীমিত সময়ের জন্য ছাড় বা অন্য লিমিটেড টাইম অফার, অনলাইন কোর্স বা এই ধরনের ডিজিটাল প্রোডাক্টে নির্দিষ্ট সংখ্যক ছাত্র নেয়ার ঘোষণা, প্রোডাক্ট বা সার্ভিসের ব্যাপারে অন্য মানুষের পজিটিভ রিভিউ, সেলিব্রিটির সাথে ডিনারের অফার, ভিডিওর থাম্বনেইলে আকর্ষণীয় কিছুর আংশিক ছবি এবং ভিডিওতে ক্লিক করলে পুরোটা দেখানোর প্রতিশ্রুতি – ইত্যাদি মানুষের মাঝে আফসোস বা মিস করার ভয় থেকে কেনার প্রবণতা তৈরী করে।

২০১৩ সালে জুলাইয়ে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সাইকোলজি, এবং রচেস্টার ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল সাইন্স ইন সাইকোলজি ডিপার্টমেন্ট, এবং আরও দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক মিলে  “Motivational, emotional, and behavioral correlates of fear of missing out” নামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

গবেষণা পত্রে তাঁরা FOMO কে এভাবে ব্যাখ্যা করেন, “অন্যরা যা পাচ্ছে, তা না পেলে কি হবে, এই নিয়ে দুশ্চিন্তা একজন মানুষকে গ্রাস করার নাম FOMO”

মার্কেটিং এর ভাষায়, “ফমো মার্কেটিং দিয়ে একটি অপ্রয়োজনীয় জিনিসকে ভয়ানক প্রয়োজনীয় হিসেবে মানুষের মনে ধাঁধা তৈরী করা যায়”

FOMO- এর ফাঁদে পড়ার যত ক্ষতি:

বিশেষ করে বাচ্চাদের এটা দারুন ভাবে প্রভাবিত করে। বিজ্ঞাপনে অন্য বাচ্চাদের কিছু খেতে দেখলে, সেটা না কিনে দেয়া পর্যন্ত তারা বাবা-মায়ের ঘুম হারাম করে ফেলে। অন্য দুইজনকে কিছু ব্যবহার করতে দেখলে, নিজের কাছে থাকা ভালো জিনিস বাদ দিয়ে সেটা পেতে ইচ্ছা করে। সেটা পাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করে।

বড় হলে আমরা এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে শিখি। কারও কাছে ভালো জিনিস দেখলে সেটা পাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করি না। কিন্তু অবচেতন মনে সেই স্বভাবটি রয়েই যায়। এই কারণেই, নিজের ভালো একটি ফোন থাকলেও নতুন মডেলের ফোন কিনতে ইচ্ছা করে, বাসায় রান্না করে অনেক কম খরচে খাওয়া যায় জেনেও রেস্টুরেন্টে যেতে ইচ্ছা করে – কারণ পরিচিত মানুষরা সেখানে যাচ্ছে, ফেসবুকে সেল্ফি দিচ্ছে।

সেল্ফির প্রসঙ্গ ধরেই বলি, সোশ্যাল মিডিয়া কিন্তু পুরোটাই ফোমো-মার্কেটিং নির্ভর।

ফেসবুকে আপনি যতই স্ক্রোল করবেন – ততই নতুন নতুন কনটেন্ট আপনার সামনে আসবে। ছবি, স্ট্যাটাস, ভিডিও – আরও কত কি! – আর এই নতুন কনটেন্টের সম্ভাবনাই ঘন্টার পর ঘন্টা আমাদের ফেসবুকে বসিয়ে রাখে। বের হতে মন চায় না, কারণ অবচেতন মন ভাবে, ”বের হলেই হয়তো নতুন কিছু মিস করে ফেলবো”

আবার মানুষ যখন দেখে, বন্ধুর ঘুরতে যাওয়ার ছবিতে শত শত লাইক ও কমেন্ট পড়েছে – তখন তারও ইচ্ছা হয় তেমনটা পেতে। সে হয়তো ঘোরাঘুরি তেমন একটা পছন্দ করে না – কিন্তু লাইক পাওয়ার লোভে ঘুরতে গিয়ে একগাদা ছবি তুলে নিয়ে আসে।

আবার দেখবেন, কিছু মানুষ ফোন হাতে নিয়ে সোফায় বসে পুরো ছুটির দিনটা কাটিয়ে দিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া ঘেঁটে।  নিজেকে কিভাবে এতে ’প্রেজেন্টেবল’ করা যায়, কিভাবে জনপ্রিয়তা পাওয়া যায় – এসব নিয়েই বহু মানুষের দিন কাটে। এর ফলে মানুষের মাঝে সম্পর্ক গুলো নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি, প্রতিনিয়ত অন্যের মত হওয়ার জন্য মানুষ চেষ্টা করে যাচ্ছে। নিজেকে ক্রমাগত ছোট ভাবছে, এবং অন্যকে হিংসা করার মাত্রা বাড়ছে।

গত বছর আমেরিকায় হওয়া ঋণ বিষয়ক একটি গবেষণায় দেখা যায় ১৮-৩৪ বছর বয়সী আমেরিকানদের মধ্যে ৪০% মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ভালো লাইফস্টাইল’ দেখাতে গিয়ে ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন।  – একটি সমাজের জন্য এরচেয়ে ভয়ঙ্কর আর কি হতে পারে?

এই সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের  যত সময় নষ্ট করছে – পৃথিবীর ইতিহাসে মনেহয় কোনওকিছু এত মানুষের এত সময় নষ্ট করতে পারেনি।

শুধু সোশ্যাল মিডিয়া কেন, ফোন মার্কেট, পোশাকের ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে খাবারের ব্র্যান্ড পর্যন্ত এই FOMO মার্কেটিং কাজে লাগিয়ে মানুষের টাকা ও সময় নষ্ট করে ফায়দা লুটছে।

মানুষের হাতে খুব ভালো কাজ করছে এমন একটি আইফোন সেভেন প্লাস থাকার পরও সে দরকার হলে ধার করেও আইফোন টেন কিনছে। কারণ আইফোন টেন না কিনলে কি হারাতে হবে – সেই ভয়ে অস্থির হওয়ার পাশাপাশি সে বন্ধুদের কাছে বা সমাজে ‘ভাব’ ধরে রাখতে চাইছে।

অন্যরা যা জানে, তা জানার আকাংখাও এর অন্তর্গত। মানুষ জন্মগত ভাবেই কৌতুহলী। এই স্বভাব মাঝে মাঝে দুর্বলতাও। যা জানার দরকার নেই, তা জানার জন্যও মানুষ পাগল হয়ে ওঠে – যখন ভাবে, অন্যরা যদি জানে, এবং সে না জানে – তাহলে কি হবে?

এই ভয় এবং কৌতুহলের কারণে মানুষ “অমুক নায়িকাকে নিয়ে একি বললেন তমুক নায়ক!” – টাইপের ভিডিও বা আর্টিকেলে ক্লিক করে। যদিও অমুক নায়িকাকে তমুক নায়ক গুলি করে মেরে ফেললেও তার কিছু যায় আসে না।

হ্যাঁ – যদি জানাটা কাজের হয়, তবে অবশ্যই জানবেন – কিন্তু যা জেনে কোনও লাভ নেই, সেই ফাঁদে পড়ার কোনও মানে হয় না। আপনি যদি বিজ্ঞানের ছাত্র বা গবেষক হন, এবং আপনার ওয়ালে যদি আপনার কাজের বিষয়ে একটি নতুন গবেষণার খবর আসে – আপনি অবশ্যই সেটা পড়তে পারেন। কিন্তু পাশের দেশের কোন নায়কের বিয়ে হওয়ায় কোন নায়িকা তিন দিন ঘর থেকে বের হননি – এটা জানা এমনকি পেশাদার পেশাদার অভিনেতা বা পরিচালকেরও দরকার নেই।

আপনি কি জানেন, সিগারেট থেকে শুরু করে মদ, গাঁজা, ইয়াবা, হিরোইনের মত নেশার শুরু হয় FOMO- এর ফাঁদে পড়ার কারণে?

বিশেষ করে বন্ধুরা যখন সিগারেট বা অন্য নেশা করে – তখন নিজেরও মনে হয়, ওরা যে মজা পাচ্ছে – তা তো আমি মিস করবো; অথবা মনে হয় ‘অভিজ্ঞতা’ নেয়ার দরকার আছে।

বাজে নেশা থেকে শুরু করে, ক্ষতিকর অসামাজিক সম্পর্ক, অতি খরচ – সবই আসলে এই – ‘না করলে কি হবে’, ‘এমন সুযোগ আর পাবো না’, ‘মানুষ কি মনে করবে’, ‘জীবন তো একটাই, এটা না করলে সারাজীবন আফসোস করতে হবে’ – ইত্যাদি মনে হওয়ার ফসল।

এই মনে হওয়া গুলোই FOMOর ফাঁদ – যা আপনার সময় ও অর্থ তো নষ্ট করেই – এমনকি জীবনও ধ্বংস করে দিতে পারে।

FOMO- এর ফাঁদ থেকে বাঁচার উপায়:

সত্যি কথা বলতে এটা মানুষের জন্মগত বৈশিষ্ট। যেটা নেই – সেটা সে পেতে চাইবে।  অন্যের কিছু থাকলে সেটা পেলে নিজের কেমন লাগবে – এটা ভাববে, এবং পেতে চাইবে।

কিন্তু এটা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, অথবা মানুষ যখন বোঝে না – এটা কি, অথবা কিভাবে এবং কেন তার ক্ষতি করছে -তখনই সে ফাঁদে পড়ে যায়।

এর আগের পয়েন্ট গুলোতে আমরা আপনাকে FOMO কি, এবং কিভাবে এটা মানুষের ক্ষতি করে – তা বোঝানোর চেষ্টা করেছি। এখন এটার নিয়ন্ত্রণ ও এই ফাঁদ থেকে বাঁচার কয়েকটি উপায় আপনাকে জানাবো।

#১. মানুষের পক্ষে সবকিছু করা এবং পাওয়া সম্ভব নয়, এবং উচিৎও নয় – এই সত্য মেনে নিন

আপনি যত দিনই বাঁচেন না কেন, আপনার পক্ষে পৃথিবীর সব খাবার খাওয়া, সবকিছু দেখা, সব প্রোডাক্ট ব্যবহার করা সম্ভব নয়। এবং সেটা উচিৎও নয়। সবকিছুর কথা বাদ দিন, পৃথিবীতে যত উপায়ে মাংস রান্না হয় – সব কি এক জীবনে চেখে দেখা সম্ভব?

আপনি যখন এই সত্যিটা উপলব্ধি করবেন যে, একজন মানুষ তার জীবনে পৃথিবীর বেশিরভাগ খাবার, অভিজ্ঞতা, পোশাক, জ্ঞান – কিছুরই স্বাদ পায়না – এবং সেটা  হাজার বছর বাঁচলেও সম্ভব নয় – তখন দেখবেন ব্যাপারটা অনেক সহজ লাগছে।

পকেটে একটি কার্যকর, দামী ফোন থাকা সত্ত্বেও যদি নতুন মডেলের ফোন কিনতে ইচ্ছা করে, তবে ভাবুন – আপনি মারা গেলেও তো আরও শত শত ডিভাইস বের হবে – সেগুলোকি আপনি ব্যবহার করতে পারবেন?, অথবা, যে ফোনটি আপনি কিনতে চাচ্ছেন, সেটা দিয়ে কি এমন কোনও বিশেষ কাজ হয় – যা না করতে পারলে আপনার দারুন ক্ষতি হয়ে যাবে?

আমরা পৃথিবীতে আসার আগে অনেক কিছু ছিল, যা এখন আর পাওয়া যায় না। আমরা চলে যাওয়ার পরও এমন অনেক মজার মজার জিনিস আসবে – যার কথা আমরা ভাবতেও পারি না। এসব নিয়ে আফসোস করে যেমন লাভ নেই, তেমনি যা দরকার নেই – তা না থাকলেও আফসোস করার কোনও মানে হয় না।

#২. আপনার চাওয়া ও প্রয়োজনের ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা রাখুন, এবং বাকি সবকিছুকে ‘না’ বলুন

চটকদার বিজ্ঞাপন বা লিমিটেড টাইম অফার দেখে আমরা অনেক সময়েই অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ি। কিন্তু অনেক সময়েই ভেবে দেখি না, এটা আসলেই আমাদের দরকা কি না। অন্যরা কিনছে, অথবা বিশেষ অফার চলছে – এই কারণে শুধু শুধু টাকা নষ্ট করি।

সোশ্যাল মিডিয়াতে বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা সহকর্মীর সাথে দরকারী কথা শেষ করে সময় নষ্ট করতে লেগে যাই। যেসব জিনিস দেখলে বা পড়লে – আমাদের বিন্দুমাত্র লাভ হবে না – সেগুলোই গিলতে থাকি।

– এমন আরও ক্ষতির কথা তো আগেই বলেছি। এর থেকে বাঁচতে হলে প্রথমেই আমরা আসলেই কি চাই, এবং কোন জিনিসটা আমাদের আসলেই দরকার – সেই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।

আমরা জীবন থেকে কি চাই, আজকের দিনে কি চাই, কি কি কাজ করতে হবে, কোন কোন জিনিসটা আসলেই কেনা প্রয়োজন, কোন জিনিসটা জানা প্রয়োজন – সেই ব্যাপারে স্পষ্ট  একটি রোডম্যাপ থাকতে হবে – এবং এর বাইরে যা-ই সামনে আসুক, যত লোভনীয় অফারই আসুক – সেগুলোকে না বলতে হবে।

আপনার যদি কাল সকালে জরুরী মিটিং থাকে, তবে বন্ধুরা যতই ফ্রিতে সিনেমা দেখার বা ঘুরতে যাওয়ার অফার দিক – তাদের না করে দিন। কারণ, সকালের মিটিং এর জন্য রাতে ভালোমত রেস্ট নেয়া বা ফাইলে চোখ বুলানো আপনার জন্য বেশি জরুরী।

যদি বাজারে গিয়ে দেখেন কোনওকিছুতে সীমিত সময়ের জন্য ছাড় চলছে, তবে সেটা কেনার আগে দেখুন, তা আপনার প্রয়োজন কি না? – যদি প্রয়োজনীয় কিছু না হয়, তবে যত কম দামে, আর যত লিমিটেড টাইম বা স্পেশাল অফারের কথাই বলা হোক না কেন – কেনার কোনও দরকার নেই।

নিজের জীবনের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই কাজ করুন। অন্য কাজে বেশি লাভের হাতছানি থাকলেও লোভের ফাঁদে পা দেবেন না। লোভের ফাঁদ, FOMO- এর ফাঁদেরই একটি রূপ।

জীবনের পাশাপাশি প্রতিটি দিনের জন্য লক্ষ্য ঠিক করুন, এবং সেই লক্ষ্য পূরণে আপনাকে কি কি করতে হবে, তা আগের রাতে, বা সেদিন সকালে লিখে রাখুন – এবং খুব জরুরী না হলে লিস্টের বাইরে কোনও কাজই করবেন না।

নিজে কি চান, এবং কি আপনার জন্য প্রয়োজন – তার ব্যপারে স্পষ্ট ধারণা থাকলে, এবং সেই অনুযায়ী কাজ করলে FOMO- এর ফাঁদের হাত থেকে অনেকটাই বেঁচে থাকবেন।

 #৩. আবেগের বদলে যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নেয়ার অভ্যাস করুন

যেসব মানুষ আবেগের বশে বেশি সিদ্ধান্ত নেয় – তারাই মূলত এই ফাঁদে বেশি পড়ে। অপ্রয়োজনে কেনাকাটা, ধার দেনা করে চটকদার পন্য কেনা, ঘন্টার পর ঘন্টা ফেসবুকে পড়ে থাকা, ঘন ঘন সেলফি বা পোস্ট আপলোড করা এবং লাইক/কমেন্টের আশায় স্ক্রিণের দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকা – এগুলোর সবই আবেগী সিদ্ধান্ত। এগুলোর বাস্তবে কোনও ভালো ফলাফল নেই।

আপনার পড়াশুনা বা কাজ আছে – কিন্তু সেগুলো বাদ দিয়ে টিভি সিরিজ বা মুভি দেখে প্রয়োজনীয় সময় নষ্ট করাও FOMO- এর ফাঁদে পড়ার কুফল।

দ্যা ভিঞ্চি কোড খ্যাত থ্রিলার লেখক ড্যান ব্রাউন তাঁর একটি রাইটিং টিউটোরিয়াল বা মাস্টারক্লাসে বলেছেন – “পাঠকের সামনে প্রশ্ন ছুঁড়ে দাও। এবং লেখার মধ্যে এমন প্রতিশ্রুতি রাখো, যেন সে বোঝে যে, পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকলে সে প্রশ্নটির উত্তর পেয়ে যাবে। কয়েক পৃষ্ঠা পর সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পাশাপাশি আরেকটা নতুন প্রশ্ন ছুঁড়ে যাও। – ‘পেজ টার্নিং’ গল্প লেখার এটাই সবচেয়ে ভালো উপায়”

গল্পের বইয়ের মত টিভি সিরিজ, সিনেমাও এই একই প্যাটার্ণ অনুসরন করে। আর এই প্রশ্নের ফাঁদ তৈরী হয় মানুষের FOMO কে কাজে লাগিয়ে।

 একটা উদাহরণ দেয়া যাক:

যে জিনিসটা চুরি গেল, সেটার মধ্যে এমন কি আছে যে সবাই এত অস্থির হয়ে উঠেছে? – আচ্ছা, চুরি যাওয়া বাক্সে প্রাচীণ আর্টিফেক্ট ছিল! চোরটাকে যে মেরে ফেলল – সে তো বক্সের মালিকের লোক নয়? – তাহলে কে সে? আর আর্টিফেক্টে কি আছে? ট্রেজার ম্যাপ, নাকি এর থেকে এমন কিছু জানা যাবে যা থেকে পৃথিবীর ইতিহাসই নতুন করে লিখতে হবে? – পরের দৃশ্যে/অধ্যায়ে কি এর উত্তর জানা যাবে? নাকি পরের পর্ব/ অধ্যায়/ সিকুয়েলে জানা যাবে?

একের পর এক এমন প্রশ্ন আপনাকে পরের দৃশ্যে বা পরের অধ্যায়ে, অথবা পরের পর্বে নিয়ে যায়।

গল্পের বই, টিভি সিরিজ, সিনেমা সবাই আপনার আবেগ আর কৌতুহলকে টার্গেট করে। পন্যের ব্র্যান্ড বা সোশ্যাল মিডিয়াও আপনার একই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে।

কিন্তু আপনি যদি আবেগের বশে সিদ্ধান্ত না নিয়ে যুক্তি ও বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেন, তবে এরা আপনাকে ফাঁদে ফেলে আপনার সময় ও অর্থ নষ্ট করতে পারবে না। আলস্যদীর্ঘসূত্রিতার হাত থেকেও বাঁচবেন।

যুক্তিভিত্তিক চিন্তার মানে, যে কোনও কাজ করার আগে তার ফলাফল বাস্তবতার দৃষ্টিতে বোঝার চেষ্টা করা। এখন যদি আরেকটি এপিসোড দেখেন, তবে কাল মিটিং বা পরীক্ষা বা ক্লাসের প্রস্তুতির কতটা ক্ষতি হবে?

নিজেকে প্রশ্ন করুন:

ফেসবুকে ‘নিলাম্বরী ঐন্দ্রিলা’ বা ‘ক্রেজি বয় সম্রাট’ এর বান্দরবানে ঘুরতে যাওয়ার ৪২টি ছবি দেখলে আমার কি লাভ হবে? আমাকে কি সকালে উঠতে হবে না? সকালে কি আমার কাজ নেই?

নেকস্ট স্ক্রোলে কার কি আপডেট আসছে – এটা জানা কি এতই জরুরী? নাকি আমার সকালের ক্লাস/অফিসে ভালো পারফর্ম করা জরুরী?

আজকে যদি মদ খাই, বা নেশা করি – তাহলে দুই বছর পর আমার অবস্থা কি হবে? এই ক্ষণিকের মজার জন্য কি আমি আমার স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার, পারিবারিক সুখ, জীবন – সবকিছু নষ্ট করতে রাজি?

– এভাবে যখন যুক্তি দিয়ে এবং বাস্তব ফলাফল মাথায় রেখে কাজ করবেন, তখন দেখবেন নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন এবং অনেক বেশি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। এবং আপনার FOMO আপনাকে ফাঁদে ফেলতে পারছে না।

পরিশিষ্ট:

আপনার নিজের জীবনকে নষ্ট করার উপাদান যেমন আপনার নিজের মধ্যেই আছে, তেমনি সেই উপাদান ধ্বংস করার ওষুধও আপনার মাঝেই আছে। প্রয়োজন শুধু এগুলোকে আলাদা করে চিনে নেয়া।

FOMO বা Fear of missing out মানব মনের এমন একটি উপাদান, যা মানুষকে ফাঁদে আটকে রাখে এবং জীবনে সামনে এগুতে দেয় না। কিন্তু আপনি আপনার মানসিক দৃঢ়তা, যুক্তি ও ইচ্ছাশক্তি দিয়ে এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেন।

আর এই বিষয়টি সম্পর্কে জানতে ও বাঁচতে যদি এই লেখাটি আপনার একটুও কাজে আসে – তাহলেই আমাদের প্রচেষ্টা সফল হবে।

অন্য অনেক পাবলিকেশনের মত এই ব্যাপারটি জেনে – তা পাঠকদের ফাঁদে ফেলার কাজে লাগানোর বদলে আমরা চেষ্টা করেছি এই ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করে তুলতে।

লড়াকুর মূল উদ্দেশ্যই হল পাঠকদের জীবনকে আরও একটু সফল করতে সাহায্য করা। মুখে সততার কথা বলে আমরা কাজে অসৎ থাকতে পারি না। কাজেই আজ ইন্টারনেট বিজনেসের সবচেয়ে বড় একটি বিজনেস সিক্রেট আপনাদের জানানোর চেষ্টা করলাম।

এটাও বলে রাখি, এই লেখাতেও এই টেকনিক দুই যায়গায় ব্যবহার করা হয়েছে। যদি ধরতে পারেন তবে কমেন্ট করে জানান।

আর যদি মনে হয় FOMO এর বিষয়ে জেনে অন্যরাও উপকৃত হবেন – তবে শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন।

গুগলে Fomo, Fomo marketing – লিখে সার্চ দিলে আরও অনেক তথ্য পাবেন। সামনে আমরা এই পদ্ধতি কিভাবে নিজের ব্যবসায় কাজে লাগাতে পারবেন (অবশ্যই নীতির মধ্যে থেকে) – তা আপনাদের জানানোর চেষ্টা করবো। গবেষণাসাপেক্ষ বিষয় বলে একটু সময় অবশ্য লাগতে পারে

তবে সে পর্যন্ত আমাদের সাথে থাকতে ভুলবেন না। সাফল্যের পথে লড়াকু সব সময়ে সৎ বন্ধু হিসেবে আপনার সাথে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *