সত্যিকার বড়লোক হওয়ার উপায়: থিংক এ্যান্ড গ্রো রিচ (বুক রিভিউ)


  • By
  • February 7th, 2019
  •    
  • পড়তে সময় লাগবে: 8 minutes
  • 4,172 views
বড়লোক হওয়ার উপায়

বড়লোক হওয়ার উপায় – শিরোনামটি দেখে হয়তো মনে হবে, এখানে তাড়াতাড়ি বড়লোক হওয়ার কৌশল নিয়ে কথা বলা হবে। কিন্তু ব্যাপারটি তার ঠিক বিপরীত। আমরা আজ যে বই থেকে আপনাকে বড়লোক হওয়ার উপায় বলব, তার নাম “থিংক এ্যান্ড গ্রো রিচ”। বইটি লিখেছেন নেপোলিয়ন হিল।

যদিও বইটির টাইটেল দেখে মনে হয়, এটা শুধু টাকা পয়সার দিক দিয়ে বড়লোক হবার উপায় এর কথা বলেছে – কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখা গেল, বইটির জ্ঞান আপনি যে কোনও ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সফলতা পাওয়ার জন্য ব্যবহার করতে পারেন।

আপনি যদি আপনার সময়ের ৫০০ জন সফলতম মানুষের সাথে সময় কাটিয়ে, তাঁদের ইনটারভিউ নিয়ে, তাঁদের সফল হওয়ার সবচেয়ে কমন বিষয়গুলো একটি বইয়ে নিয়ে আসেন – সেটা অবশ্যই সফল হওয়ার একটি সেরা গাইড হবে। নেপোলিয়ন হিল ঠিক সেটাই করেছেন।  তাঁর সময়ের সবচেয়ে সফল ৫০০ জন মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে (এঁদের মধ্যে এ্যান্ড্রু কার্নেগী এবং টমাস আলভা এডিসন এর মত মানুষও ছিলেন) ২০ বছর সময় নিয়ে তিনি বইটি শেষ করেন।

১৯৩৭ সালে প্রকাশ হওয়া এই সেলফ্‌ ডেভেলপমেন্ট মাস্টারপিসটি আজও সমান ভাবে জনপ্রিয়। আজ পর্যন্ত বইটির ৩০ মিলিয়ন কপিরও বেশি বৈধ ভাবে বিক্রী হয়েছে। আর পাইরেটেড কপি এবং ই-বুক খুব সম্ভবত বৈধ বিক্রীকেও ছাড়িয়ে গেছে। ঢাকা শহরের নীলক্ষেতের ফুটপাথেও ১০০ টাকায় বইটি পাবেন।  কিন্তু এই ১০০ টাকার বইয়ে এমন জ্ঞান আছে, যা কাজে লাগাতে পারলে আপনি হয়তো এক সময়ে ১০০ কোটির মালিক হবেন, অথবা আপনি যে ক্ষেত্রে কাজ করেন – সেই ক্ষেত্রের সেরাদের সেরা একজন হিসেবে গন্য হবেন।

বর্তমানে যত সেলফ ডেভেলপমেন্ট বই বের হচ্ছে, তার বেশিরভাগ কোনও না কোনও ভাবে নেপোলিয়ন হিল এর “থিংক এ্যান্ড গ্রো রিচ” এবং ডেল কার্নেগীর “হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস এ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল” থেকে অনুপ্রাণিত।  হাউ টু উইন ফ্রেন্ডস এ্যান্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল এর বুক রিভিউ আমরা ইতোমধ্যে করেছি, আজ আমরা থিংক এ্যান্ড গ্রো রিচ এর ১০টি সেরা প্রিন্সিপাল বা নীতি নিয়ে আলোচনা করব।  

এগুলো জানা থাকলে আপনি যেমন এগুলো কাজে লাগিয়ে উপকৃত হতে পারবেন, আবার প্রায় ২৫০ পৃষ্ঠার বইটি পড়তে গেলে, তা বুঝতে আপনার সুবিধা হবে।

তবে চলুন নেপোলিয়ন হিল এর থিংক এ্যান্ড গ্রো রিচ বইটির সেরা ১০টি নীতি থেকে জেনে নেয়া যাক সত্যিকার বড়লোক হওয়ার উপায় গুলো।

০১. সঠিক মনোভাব

বড়লোক

আগেই বলেছি, এই বইটি সহজে বড়লোক হওয়ার উপায় টাইপের কিছু নয়।  এটা আসলে নিজেকে সর্বোচ্চ সফল হওয়ার যোগ্য করে তোলার জন্য একটি গাইড।  রাতারাতি সফল বলে কিছু নেই।  কারও জীবনেই হঠা‌ৎ সাফল্য আসে না।  এর পেছনে দীর্ঘ দিনের শ্রম আর অপেক্ষার গল্প থাকে।  হয়তো সবার গল্পটা জানা যায় না।  সেকারণেই কাউকে কাউকে মনে হয় তারা রাতারাতি সফল হয়ে গেছে।  যে সফলতা দেখা যায়, তা অর্জন করার আগে সেই সাফল্য অর্জন করার যোগ্য মানুষ হয়ে উঠতে হয়।

নেপোলিয়ন হিল বলেন, ধনী বা বড়লোক হওয়া যতটা না টাকার অংকের ব্যাপার, তারচেয়ে বেশি নিজের যোগ্যতাকে সেই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপার।  সঠিক মনোভাব না থাকলে আপনাকে যত টাকাই দেয়া হোক, আপনি সেই টাকা বা সাফল্য ধরে রাখতে পারবেন না।  সেটা এক সময়ে হাতছাড়া হয়ে যাবে।  শক্ত গাছগুলো ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে।  যেসব গাছ খুব দ্রুত লম্বা হয়, হাল্কা ঝড়েই সেগুলো ভেঙে পড়ে।  আর যে গাছগুলো একটু একটু করে কান্ডকে শক্তিশালী করতে করতে বেড়ে ওঠে, প্রবল ঝড়েও তারা ভাঙে না।  – এই ব্যাপারটিও তেমন।  আজ পর্যন্ত যারাই হঠা‌ৎ করে বড় হয়েছে, তারা সেটা ধরে রাখতে পারেনি।  লেখক “Growing Rich” এবং “Becoming Rich” – কে আলাদা করে দেখিয়েছেন।  গ্রোইং রিচ মানে ধনী হিসেবে গড়ে ওঠা, শুধু ধনী হওয়া নয়।  মানুষ লটারি জিতে, বা অন্যের সম্পত্তি পেয়েও ধনী হতে পারে।  ৯০% এর বেশি লটারি বিজয়ী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সম্পদ নষ্ট করে ফেলে।

যারা নিজের চেষ্টায় বড় হন, তাঁদের বুদ্ধি ও মনোভাব সেভাবেই শক্তিশালী হয়, যাতে করে সেই সম্পদ, খ্যাতি, বা ক্ষমতা তাঁরা ধরে রাখতে পারেন।  আজ যার কাছে ১০০ টাকা আছে, কাল তাকে এক কোটি দিলে, তার পুরো টাকাটা ভোগ করে উড়িয়ে দেয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

লেখক বলেন, যদি কয়েকজন নিজের চেষ্টায় ধনী হওয়া মানুষের কাছ থেকে তাঁদের সব সম্পদ একবারে নিয়ে যাওয়া হয়, এবং দশ বছর একটি ঘরে আটকে রেখে ছেড়ে দেয়া হয় – তাঁদের পক্ষে আবারও সেই সম্পদ অর্জন করা সম্ভব।  কারণ, প্রথমবার সেই সম্পদ অর্জন করতে গিয়ে তাঁদের মাঝে যে মনোভাব তৈরী হয়েছিল, সেটা তখনও থেকে যাবে। তাঁরা জানবেন, কি করে সম্পদ, খ্যাতি, সাফল্য অর্জন করতে হয়।  অন্যদিকে যারা নিজের চেষ্টায় ধনী হননি, তাদের সম্পদ চলে গেলে তারা একদম অন্ধকারে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

নিজের চেষ্টায় বড়লোক বা ধনী হওয়ার প্রথম শর্তই এই মনোভাব নিজের মধ্যে নিয়ে আসা যে, “আমাকে সেই দক্ষতা, যোগ্যতা, ও মানসিকতা অর্জন করতে হবে – যেন আমার সব সম্পদ চলে গেলেও আমি আবার তা অর্জন করতে পারি”।  শুধু টাকা বা সাফল্যের মাপে নয়, সত্যিকার বড়লোক হতে হলে আপনাকে এমন মানুষ হয়ে উঠতে হবে – যে চাইলেই সেই সম্পদ আবার অর্জন করার শক্তি রাখে।  মানুষ হিসেবে সেই সম্পদ অর্জন ও ধরে রাখার ক্ষমতা আপনার কতটুকু – সেটাই আপনার ধনী হওয়ার যোগ্যতা মাপবে।

০২. সুতীব্র আকাঙ্খা

আকাঙ্খা বা desire মানে কোনওকিছু পাওয়ার ইচ্ছা।  লেখক একে বলেছেন “Burning Desire” – অর্থা‌ৎ, সুতীব্র ইচ্ছা।  আপনি জীবনে যা করতে চান, তার জন্য আপনার তীব্র ইচ্ছা থাকতে হবে।  হয়তো আপনি ধনী ব্যবসায়ী হতে চান, বড় শিল্পী হতে চান, বড় স্কলার হতে চান, বড় কর্মকর্তা হতে চান – যেটাই আপনি চান না কেন, সেটা পাওয়ার জন্য আপনার ইচ্ছা হতে হবে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি।  চাওয়াটাকে পাগলামির পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে।  আপনি হয়তো এমন অনেক সফল মানুষের কথা শুনেছেন – যাঁরা সফল হওয়ার আগে, সবাই তাদের পাগল বলতো।  সবকিছু তাঁদের বিপরীতে থাকার পরও তাঁরা চেষ্টা করে গেছেন।  এই চেষ্টাটা এসেছে আসলে সেই সুতীব্র আকাঙ্খা থেকে।

৭১১ খৃষ্টাব্দে মুসলিম সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ স্পেনের ইবেরিয়ান প্রদেশে যুদ্ধ করতে যান, তাঁর বাহিনীর চেয়ে শত্রু  বাহিনীর সংখ্যা ছিল ১০ গুণ।  তারিক তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে জাহাজে করে ইবেরিয়ান উপকূলে পৌঁছানোর পর তাঁর সৈন্যরা শত্রু বাহিনীর আকার দেখে ভয় পেয়ে যায়।  তিনি তাদের জাহাজ গুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন, যাতে করে পালানোর পথ না থাকে।  জাহাজ পোড়ানোর পর তাঁর বাহিনীর সামনে দু’টো পথ খোলা থাকে, হয় জিততে হবে; নাহয় মরতে হবে।  শেষ পর্যন্ত তারিকের ১২০০০ সৈন্যের বাহিনী শত্রুদের প্রায় ১ লাখ সৈন্যের বাহিনীকে পরাজিত করে।  

১৫১৯ সালে স্প্যানিশ সেনাপতি হার্নান্দো কর্টেজও মেক্সিকো দখলের সময়ে স্থানীয় এ্যাজটেকদের সাথে যুদ্ধে একই কাজ করেন।  বিপূল সংখ্যক মায়ান সৈন্য দেখে তাঁর বাহিনী যখন ভয় পেয়ে যায়, তিনি তাঁর সৈন্যদের সব জাহাজ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন- এবং তারা সেই যুদ্ধে জয়লাভ করেন।

এই দু’টি কাহিনী থেকে একটি শিক্ষা নেয়ার আছে।  আপনার মাঝে যদি কিছু পাওয়ার ইচ্ছা এতটাই তীব্র হয় – যার ওপর আপনার জীবন নির্ভর করছে – বাধা যত কঠিনই হোক না কেন, আপনার জেতার সম্ভাবনা আছে।  নেপোলিয়ন হিল আমাদের মাঝে সেই ‘জাহাজ পোড়ানোর মানসিকতা’ রাখতে বলেছেন – যদি আমরা সত্যিকার সফল হতে চাই।

বড় বড় উদ্যোক্তা, অথবা অন্য অনেক সফল মানুষদের জীবনী ঘাঁটলেও দেখা যায়, তাঁরা এই সুতীব্র আকাঙ্খার কারণে, সব কিছু তাঁদের বিপরীতে থাকলেও কাজ করে গেছেন – এবং অবশেষে সফল হয়েছেন।  বিল গেটস, ইলন মাস্ক হার্ভার্ডে পড়া ছেড়ে দিয়েছেন, বিজয় শেখর শর্মা তাঁর সব জমানো টাকা পে-টিএম এর পেছনে ইনভেস্ট করে রাতের পর রাত শুধু পানি খেয়ে কাটিয়েছেন।  বড় বড় চাকরির অফার নাকচ করে কোম্পানী নিয়ে পড়ে থেকেছেন।  আজ তিনি সবচেয়ে কম বয়সে বিলিয়নেয়ার হওয়া ভারতীয়।

আজ যদি আপনার পকেটে খাবার কেনার টাকাও না থাকে, অথবা আপনাকে সাহায্য করার মত একটি মানুষও না থাকে – তবুও আপনার পক্ষে একদিন বিরাট ধনী বা সফল হওয়া সম্ভব – যদি আপনার মাঝে সেই সুতীব্র আকাঙ্খা থাকে।

আপনার হয়তো ইচ্ছা আপনি একদিন নিজের একটি টেক্সটাইল মিল দেবেন, এখন ছোট একটা চাকরিও করছেন একটি টেক্সটাইল মিলে।  এখন যদি একটি ওষুধ কোম্পানী থেকে ডাবল বেতনে চাকরি করার অফার আসে – তবে আপনি কি করবেন? – টেক্সটাইলের কাজ ভালোভাবে শেখার জন্য অল্প বেতনে সেখানেই থাকবেন? নাকি ডাবল বেতনের লোভে ওষুধ কোম্পানীতে জয়েন করবেন।  আপনার মাঝে যদি সত্যিই টেক্সটাইল এর ব্যবসা করার সুতীব্র আকাঙ্খা থাকে – তবে আপনি টেক্সটাইল মিলেই থেকে যাবেন।  বেশি বেতনে ওষুধ কোম্পানীতে যাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করাটাকে আপনি জাহাজ পোড়ানোর সাথে তুলনা করতে পারেন।  আপনি যদি বেশি বেতনের লোভে কাজের সেক্টর পরিবর্তন করে ফেলেন – তবে অবশ্যই আপনার মাঝে সেই সুতীব্র আকাঙ্খা নেই।

আপনার মাঝে যদি কোনওকিছু করার সুতীব্র আকাঙ্খা থাকে, তবে আপনি না খেয়ে দিন পার করলেও সেই সেক্টর ছাড়বেন না।  যত খারাপ অবস্থাই হোক, আপনি আপনার স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা বন্ধ করবেন না। এবং তখন আপনার সফল হওয়াটা শুধুই সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

০৩. বিশ্বাস

আত্মবিশ্বাস

আগের পয়েন্টের প্রসঙ্গ ধরেই বলি, আপনি যদি আপনার সবকিছু দিয়ে শুধু একটি স্বপ্ন পূরণের পেছনে ছোটেন, তবে অবশ্যই আপনার মাঝে বিশ্বাস থাকতে হবে।  যতক্ষণ না আপনি পুরোপুরি বিশ্বাস করছেন যে, স্বপ্ন পূরণের ক্ষমতা আপনার আছে – ততক্ষণ আপনি সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য নিজের সবকিছু উ‌ৎসর্গ করতে পারবেন না।

মনের মধ্যে যদি নিজের সাফল্যের বিষয়ে সন্দেহ থাকে, তবে আপনার পক্ষে বেশি বেতন বা সুযোগ সুবিধার লোভ সামলানো কঠিন হয়ে যাবে।  অন্য কথায় – আপনি ‘জাহাজ পোড়াতে’ পারবেন না।

নিজের ভেতরে বিশ্বাসকে দৃঢ় করার জন্য একটা দারুন পদ্ধতি আছে।  একটি অবিশ্বাস্য ঘটনার ভিডিও যদি আপনাকে বার বার দেখানো হয়, অথবা অবিশ্বাস্য কাহিনী শোনানো হয় – তবে আপনি এক সময়ে সেটা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে শুরু করবেন।  মানুষের মনের গঠনই এমন।

আবার ধরুন, একজন সাধারণ মানুষকে যদি কোনও ভাবে বিশ্বাস করানো যায় যে, আগামী ১০ বছরের ভেতরে সে রাজা হবে – তবে দেখবেন, তার আচরণই বদলে গেছে।  আপনিও যদি নিজেকে পুরোপুরি বিশ্বাস করাতে পারেন যে, আপনি সফল হবেন – তাহলে আপনার কাজ ও আচরণও সেইরকম হয়ে যাবে।  এবং এই কাজ ও আচরণের ফলেই আপনি সফল বা ধনী হবেন।  আপনার ওজন যদি হয় ৯০ কেজি, যেখানে আপনার ওজন হওয়ার কথা ৬০কেজি।  আপনি যদি বিশ্বাস করেন, এক বছরের মধ্যে আপনি ৩০ কেজি কমাতে পারবেন – তখনই আপনি জিমে ঢোকা বা খাওয়া কমানোর পদক্ষেপগুলো নেবেন।  আর যখনই আপনি পদক্ষেপ নেবেন – তখন এমনিতেই অর্জনের প্রসেস শুরু হয়ে যাবে।

এই বিশ্বাস নিজের মধ্যে আনার জন্য আপনাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না।  একটি কার্ডের এক পাশে লিখুন আপনি কবে, এবং কী অর্জন করতে চান।  এবং অন্য পাশে লিখুন “যে বিশ্বাস করতে পারে, সে অর্জন করতে পারে।  আমি বিশ্বাস করি, আমি অর্জন করব”।  এরপর প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে ও ঘুম থেকে ওঠার পর কার্ডটি দেখুন।  এছাড়া প্রতিদিন সকালে উঠে নিরিবিলি চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন, আপনি যা অর্জন করতে চান – তা অর্জন করে ফেলেছেন।  কল্পনাটিকে বিশ্বাস করার চেষ্টা করুন।  প্রথমে কেমন কেমন লাগলেও একটা সময়ে দেখবেন ব্যাপারটিকে আপনি বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন।

প্রতিদিন সকাল বেলা উঠে কিছুক্ষণ যা করতে চান, তা কল্পনা করা, নিজের উদ্দেশ্যে ভালো কিছু বলা, মোটিভেশনাল উক্তি বা বই পড়া – ইত্যাদি আপনার দিনটিকে অনেক বেশি সফল করবে।  এবং আপনার নিজের প্রতি বিশ্বাসও অনেক বেড়ে যাবে।  সফল হওয়ার সকালের রুটিন বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের মিরাকেল মর্নিং নিয়ে লেখাটি পড়ুন।  নিজের ও নিজের লক্ষ্যের প্রতি বিশ্বাস বাড়াতে এটি খুবই কার্যকর।

০৪. হার না মানা মনোভাব

একজন মানুষ ততক্ষণ সত্যিকারে হারে না, যতক্ষণ না সে হার মেনে নিচ্ছে।  আপনি যখন নিজের মত করে কিছু করতে যাবেন, অথবা নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটবেন – তখন চারপাশ থেকে অনেক বাধা আপনাকে থামাতে চাইবে।  মানুষ হয়তো আপনাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে।  কিন্তু আপনাকে হার মানলে চলবে না।

নেপোলিয়ন হিল লিখেছেন, একজন মানুষের চূড়ান্ত সফল হওয়ার পথে কিছু সাময়িক পরাজয় আসবেই। এগুলো এড়ানো সম্ভব নয়।

বড়লোক হওয়া বা অন্য বড় স্বপ্ন পূরণ করার জন্য আপনার মধ্যে হার না মানা মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে।  যে পরিস্থিতিতেই পড়েন না কেন- সব সময়ে পজিটিভ থাকতে হবে।  পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে হবে।  আমাদের জীবন আমাদের সিদ্ধান্তগুলোর ফল।  কোন পরিস্থিতিতে আপনি কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, কোন ঘটনায় আপনার রি এ্যাকশন কি হচ্ছে – এসবের ওপর আপনার ভবিষ্য‌ৎ সাফল্য বা ব্যর্থতা অনেকটাই নির্ভর করে।

অনেক সময়েই আপনার মনে হবে, এসব করে লাভ নেই; হয়তো দারুন হতাশায় সব ছেড়ে ছুড়ে চলে যেতে ইচ্ছে হবে – কিন্তু আপনি যদি সফল হতে চান – তবে হার না মেনে কাজ করে যেতে হবে।  অনুভূতির ওপর হয়তো আপনার নিয়ন্ত্রণ নেই, কিন্তু সেই অনুভূতির রিএ্যাকশন কেমন হবে – সেই সিদ্ধান্ত আপনি নিতে পারেন।  এই ক্ষমতাটি কাজে লাগান।  কাজ করতে ইচ্ছে না করলেও জোর করে কাজ করুন।  হতাশা আসলে জোর করে নিজেকে আশাবাদী করুন।

লেখক বলেন, যখন সাময়িক ব্যর্থতা আসে, তখন সবচেয়ে সহজ কাজ হল হার মেনে নেয়া।  এবং বেশিরভাগ লোক এটাই করে।  ৫০০ এরও বেশি সফল মানুষ লেখককে বলেছেন, তাঁদের বেশিরভাগ সাফল্য এমন সময়ে এসেছে, যখন তাঁরা হার মেনে নিতে গিয়েও আর একবার চেষ্টা করতে গিয়েছেন।  তাঁরা এমন খারাপ অবস্থায় পড়েছিলেন যে, সবকিছু ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত প্রায় নিয়ে ফেলেছিলেন।  কিন্তু প্রতিবার তাঁরা নিজেকে বলেছেন, আর একটা বার চেষ্টা করে দেখি।  এই ‘আর একটা বার চেষ্টা করার’ মনোভাবই আসলে হার না মানার মনোভাব।  আপনি যতবারই হারেন না কেন, প্রতিবার নিজেকে বলুন, “আর একবার চেষ্টা করে দেখা যাক”।  আপনি কখনওই জানবেন না, সাফল্য ঠিক কখন আপনার হাতে ধরা দেবে, কিন্তু যদি হার না মেনে চেষ্টা করে যান – তবে একদিন না একদিন সে ধরা দেবেই।

০৫. বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতা

ছোটবেলায় আমরা পড়েছি, বিজ্ঞান মানে বিশেষ জ্ঞান।  তবে নেপোলিয়ন হিল এখানে বিশেষ জ্ঞান বা “specialized knowledge বলতে বিজ্ঞানকে বোঝাননি।  এখানে তিনি কোনও একটি বিষয়ে গভীর ও বিশেষ দক্ষতা ও জ্ঞানের কথা বলেছেন।

লেখকের মতে, জ্ঞান দুই ধরনের: সাধারণ জ্ঞান, ও বিশেষ জ্ঞান।  বিশেষ জ্ঞান মানে কোনও একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া। সাধারণ জ্ঞান বলতে শুধু দেশের নাম ও দেশের রাজধানীর নাম – বা এই ধরনের জ্ঞান নয়।  একটি নির্দিষ্ট বিষয়েও সাধারণ জ্ঞান থাকতে পারে।  একজন মানুষ যদি একটি বিষয়ের সবগুলো দিকেই কিছু কিছু জ্ঞান রাখে, তবে তাকে সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ বলা যাবে না।

একজন ডাক্তারের কথা ধরা যাক, যিনি সব ধরনের রোগ ও সেগুলোর চিকি‌ৎসা সম্পর্কে কিছু কিছু জানেন।  তাঁকে কোনওভাবেই বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বলা যাবে না।  এই ধরনের ডাক্তার অনেক আছেন, এবং তাঁদের পসারও খুব বেশি নয়।  আবার কিছু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আছেন, যাঁরা সব রোগ সম্পর্কে ধারণা থাকার পরও একটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন।  এই ধরনের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি।  এবং এঁদের ইনকামও অন্যদের চেয়ে বেশি।  আপনার লিভারে সমস্যা হলে আপনি নিশ্চই সাধারণ ডাক্তারের বদলে একজন লিভার বিশেষজ্ঞকেই দেখাতে চাইবেন।

বিশেষজ্ঞ হওয়া মানে একটি বড় বিষয়ের একটি ছোট অংশ সম্পর্কে অনেক বেশি জানা।   বড় বিষয়ের সবগুলো দিক সম্পর্কে বা অনেক বিষয়ে কিছু কিছু জানার চেয়ে একটি মাত্র ছোট বিষয়ে অনেক কিছু বা সবকিছু জানা অনেক বেশি কার্যকর।  বিশেষ করে যদি আপনি তাকে কাজে লাগিয়ে আর্থিক সাফল্য চান।  আপনি যদি সব ধরনের ব্যবসার ব্যাপারে কিছু কিছু জানার বদলে একটি নির্দিষ্ট ব্যবসা, যেমন ধরুন ঘড়ির ব্যবসা সম্পর্কে সবকিছু জানেন – তবে ব্যবসা করে সফল হওয়ার সম্ভাবনা আপনার অনেক বেশি।

নেপোলিয়ন হিল বড়লোক হওয়ার ক্ষেত্রে এই বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করাকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

রিলেটেড পোস্ট: বিশেষজ্ঞ কারা ? – কিভাবে একজন বিশেষজ্ঞ হওয়া যায়?

০৬. বড় লক্ষ্যকে ছোট ছোট লক্ষ্যে ভাগ করা

বড়লোক হওয়ার উপায় পরিকল্পনা

লেখক বলেন, ধনী বা বড়লোক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে।  রাতারাতি সত্যিকার বড়লোক কেউ হতে পারে না।  এই দীর্ঘ সময় ধরে মোটিভেশন ধরে রাখা অনেক সময়েই কঠিন হয়ে যায়।  আপনার যদি লক্ষ্য থাকে, ৫ বছর পর ১ কোটি টাকার মালিক হবেন – তাহলে প্রথম বছর যখন দেখবেন ১০ লাখ টাকাও আয় করতে পারেননি – তখন একটু হতাশা আসা স্বাভাবিক।

এই অবস্থা যাতে না হয়, সেজন্য লেখক একটি ভালো সমাধান দিয়েছেন।  তাঁর ভাষায় এটা “Organized Planning” – বা গোছানো পরিকল্পনা।  আপনার বড় লক্ষ্যটিকে ছোট ছোট লক্ষ্যে ভাগ করুন।  তারপর এক সময়ে মাত্র একটি ছোট লক্ষ্য পূরণে আপনার সব মনোযোগ দিন।  একটি বড় লক্ষ্যকে ১০টি ছোট লক্ষ্যে ভাগ করে নিলে প্রতিটি ছোট লক্ষ্য পূরণের সাথে সাথে আপনার মাঝে নতুন উদ্যম সৃষ্টি হবে।

ম্যারাথন দৌড় হয় ২৬ মাইলের।  কিন্তু আপনি যদি একজন ম্যারাথন দৌড়বিদ হতে চান, এবং যদি প্রথমেই ২৬ মাইল দৌড়ানোর চেষ্টা করেন, তবে আপনার ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।  ২৬ মাইল দৌড়ানোর ক্ষমতা অর্জনের জন্য আপনাকে প্রথমে ১ মাইল দৌড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।  এরপর যখন এটা আপনার জন্য সহজ হয়ে যাবে, আপনি ২ মাইল দৌড়ানোর ক্ষমতা অর্জনের আত্মবিশ্বাস পাবেন।  এভাবে ধীরে ধীরে একটানা ২৬ মাইল দৌড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করবেন।

১০ বছরের লক্ষ্যকে এক বছর, এক বছর কে ১২ মাস এবং ১২ মাসকে ৫২ সপ্তাহ – এভাবে প্রতিটি দিনের লক্ষ্য ঠিক করুন এবং সেই লক্ষ্য পূরণে কাজ করুন। দেখবেন প্রতিদিনই আপনি অনুপ্রাণিত থাকছেন। 

একটি বড় লক্ষ্যকে যখন আপনি ছোট ছোট পরিকল্পনা বা ছোট ছোট লক্ষ্যে ভাগ করবেন – তখন আপনি নিজেই নিজের ভবিষ্য‌ৎ সাফল্য পরিস্কার দেখতে পাবেন। সেইসাথে, লক্ষ্য অর্জনের জন্য অনুপ্রেরণারও কোনও অভাব হবে না।

০৭. ধৈর্য

ধৈর্য

আপনি বড়লোক হতে চান, অথবা অন্য যে কোনও বড় লক্ষ্যই অর্জন করতে চান – ধৈর্য ধরে চেষ্টা করা ছাড়া কোনও উপায় নেই।  পৃথিবীর প্রায় সব সফল মানুষ ধৈর্য নিয়ে উক্তি করেছেন।  কারণ, তাঁদের সাফল্যের পেছনে ধৈর্যের অনেক বড় অবদান ছিল।

বিল গেটস একবার বলেছিলেন, তাঁর রাতারাতি সাফল্যের পেছনে ছিল ১০ বছরের ধৈর্য আর পরিশ্রম।  ১০টি বছর তাঁর কাছে দেখানোর মত কিছু ছিল না।  কিন্তু তাঁর আকাঙ্খা ছিল, তিনি একদিন বিরাট কিছু করে দেখাবেন।  তাই বার বার ব্যর্থ হয়েও তিনি চেষ্টা করে গেছেন।  তিনি যদি ৯ম বছরে ধৈর্য আর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতেন, তবে আজ প্রযুক্তি জগতে বিপ্লব ঘটাতে পারতেন না।

টমাস আলভা এডিসন কার্যকর বৈদ্যুতিক বাতি বানানোর আগে ১০ হাজার বার ব্যর্থ হয়েছিলেন।  কিন্তু তিনি ধৈর্য হারাননি, এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সফল হয়েছিলেন।

সফল মানুষের ব্যর্থতার গল্প লেখাটিতে আমরা কেএফসির প্রতিষ্ঠাতা কনোনেল স্যান্ডার্স এর কথা বলেছিলাম।  ৬০ বছরের বেশি বয়সে যখন তাঁর সব শেষ হয়ে গিয়েছিল, তিনি ঠিক করেছিলেন তাঁর নিজের বানানো চিকেন ফ্রাই এর রেসিপি দিয়ে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবেন।  নিজের রেস্টুরেন্ট দেয়ার মত টাকা তাঁর হাতে ছিল না।  নিজের শেষ রেস্টুরেন্ট বন্ধ হওয়ার পর তাঁর হাতে মাত্র ১৬৫ ডলার ছিল।  তিনি একটার পর একটা রেস্টুরেন্টে গিলে বলেছিলেন, “আমার কাছে দারুন একটি রেসিপি আছে।  এটার জন্য আমাকে তোমাদের কোনও টাকা দিতে হবে না; শুধু লাভ হলে তার থেকে কিছু দিলেই চলবে। ” – রেস্টুরেন্টগুলো তাঁর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিতে লাগলো।  তিনি কয়টি রেস্টুরেন্ট তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছে – তার হিসাব রাখতে শুরু করলেন।  এক এক করে ১০০৯টি রেস্টুরেন্ট তাঁকে ফিরিয়ে দেয়; অবশেষে ১০১০ নম্বর রেস্টুরেন্টের দরজায় কড়া নাড়ার পর তারা তাঁর প্রস্তাবে রাজি হয়।  আজ পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ও লাভজনক রেস্টুরেন্ট চেইনের একটি কেএফসি।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী লেখিকা জে কে রাউলিং এর জীবনী থেকে জানা যায়, তাঁর হ্যারি পটার সিরিজটি প্রকাশিত হওয়ার আগে ১২টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তাকে ফিরিয়ে দেয়।  সবাই বলেছিল, এই গল্প চলবে না।  কিন্তু রাউলিং ধৈর্য ধরে চেষ্টা করে গেছেন।  এবং শেষ পর্যন্ত একটি ছোট প্রকাশনী থেকে হ্যারি পটার প্রকাশ হওয়ার পর তা বিশ্ব সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করে।

পৃথিবীর প্রতিটি সফল মানুষের গল্পই এমন।  দূর থেকে দেখে মনে হয় মানুষটি রাতারাতি সফল হয়েছেন, কিন্তু এর প্রতিটির পেছনেই আছে ধৈর্য ধরে দিনের পর দিন কষ্ট করার ইতিহাস।  নেপোলিয়ন হিলের মতে, বড়লোক হওয়ার প্রধান উপায়ই হল আকাঙ্খা ও বিশ্বাসের পাশাপাশি আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে।  যত দিনই যাক, যত বছরই যাক – ধৈর্য না হারালে একদিন না একদিন আপনার আশা পূর্ণ হবেই।

০৮. ভালো সঙ্গ

বইয়ের এই পর্যায়ে নেপোলিয়ন হিল এমন মানুষের সাথে চলার কথা বলেছেন, যারা আপনাকে বড় হওয়ার পথে সাহায্য করতে পারবে।  এখানে তিনি বলেননি যে, তাদের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য নিন।  আমরা যে ৫ জন মানুষের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটাই – তাদের মিলিয়েই আমাদের স্বভাব গড়ে ওঠে।  আপনি যদি ৫জন সফল ব্যবসায়ীর সাথে বেশিরভাগ সময় কাটান, তবে ব্যবসা সম্পর্কে এমনিতেই আপনার জ্ঞান ও সেন্স বাড়বে।  ৫জন ডাক্তারের সাথে বেশিরভাগ সময় কাটালে চিকি‌ৎসা বিষয়ে এমনিতেই আপনার ভালো জ্ঞান হবে।  অন্যদিকে আপনি যদি হতাশ ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের সাথে বেশিরভাগ সময় কাটান – তবে একটা সময়ে আপনিও তাদের মত হয়ে যাবেন।

নেপোলিয়ন হিল এই প্রক্রিয়াকে “মাস্টার মাইন্ড” বলেছেন।  ধনী হতে হলে আপনাকে এমন মানুষের সাথে বেশিরভাগ সময় কাটাতে হবে – যারা ইতোমধ্যে ধনী, অথবা ধনী হতে চায়।  এমন মানুষের সাথে আপনি যত বেশি সময় কাটাবেন – বড়লোক হওয়ার উপায় নিয়ে তত বেশি চর্চার মধ্যে থাকবেন।

থিংক এ্যান্ড গ্রো রিচ এর মূল বিষয়টাই হল নিজের মধ্যে ধনী হওয়ার চিন্তা ও আগ্রহকে শক্তিশালী করা।  এই চিন্তা যত শক্তিশালী হবে – আপনার পক্ষে সত্যিকার ধনী বা সফল হওয়া ততই সহজ হবে।  ৮০/২০ প্রিন্সিপাল অনুযায়ী, মানুষের সাফল্য বা ব্যর্থতার ৮০% নির্ভর করে তার চিন্তা ও মানসিকতার ওপর।

লেখক বলেন, মাস্টার মাইন্ড পদ্ধতি সবচেয়ে উপকারী হয় তখন, যখন আপনি আপনার মত মানসিকতার ৩জন, ৫জন, বা ৭জন মানুষকে এক করে নিয়মিত আপনাদের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করবেন।  এতে তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারবেন, এবং মানসিক ভাবে চাঙ্গা থাকতে পারবেন।  ৩ জন ৩০ বছর বয়সী মানুষ এক হওয়া মানে সেখানে ৯০ বছরের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান এক হওয়া।  সবাই সবার কাছ থেকে কিছু না কিছু শিখতে পারবে।  আপনি যা-ই করতে চান না কেন, সমমনা ও অভিজ্ঞ কিছু মানুষকে এক করার চেষ্টা করুন, এবং নিয়মিত তাদের সাথে আলোচনা করুন।  প্রতি সপ্তাহে যদি এটা করতে পারেন, তবে এক সপ্তাহে অন্যরা যা যা শিখেছে – সেই জ্ঞান আপনি নিতে পারবেন, এবং সেইসাথে, আপনি নিজে যা শিখেছেন – তা নিয়েও আলোচনা করতে পারবেন।

এভাবে গ্রুপ করতে না পারলেও সব সময়ে চেষ্টা করুন ইতিবাচক ও সফল মানুষের সাথে চলতে।  হতাশ ও নেতিবাচক মানুষদের যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।  সফল হওয়ার মানসিকতা গড়তে এটা খুবই কার্যকর।

০৯. নিজেকে সময় দেয়া

সফল হওয়ার জন্য যেমন অন্যদের সাথে ভালো যোগাযোগের দরকার, তেমনি সম্পূর্ণ নিজেকে সময় দেয়াও দরকার।  নিজের জীবন, লক্ষ্য ও পরিকল্পনা নিয়ে গভীর চিন্তা ও চর্চার জন্য নিজের জন্য সময় রাখতে হবে।  লেখক একে বলেছেন “নিজেকে একঘেয়ে করে ফেলা”।  সপ্তাহে বা মাসে একটা দিন যদি আপনি পুরো দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন – এবং কোনও কাজও না করেন – তাহলেই দিনের একটা পর্যায়ে আপনি নিজেকে নিয়ে সেই গভীর চিন্তায় ডুবে যেতে পারবেন।

পোষা প্রাণী, বই, ইন্টারনেট – সবকিছু থেকে নিজেকে দূরে রাখুন।  কিছু না করতে করতে একটা সময়ে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে চিন্তা আপনার মাথায় আসতে শুরু করবে।  অগোছালো চিন্তাগুলোও এক সময়ে শেষ হবে।  তারপর আপনার একঘেয়ে লাগতে শুরু করবে – এবং তারপর আপনার মাথায় নিজেকে নিয়ে এবং নিজের জীবন নিয়ে চিন্তা আসতে শুরু করবে।

আপনি এখন ঠিক কোন অবস্থায় আছেন, কোন অবস্থায় যেতে চান, এবং সেই অবস্থায় যেতে হলে আপনাকে কি কি করতে হবে – এইসব চিন্তা খুব পরিস্কার হয়ে আপনার সামনে চলে আসবে।  এভাবে নিয়মিত একা থাকার অভ্যাস করলে, আপনি নিজেই নিজের বর্তমান অবস্থান ও ভবিষ্য‌ৎ পরিকল্পনা নিয়ে পরিস্কার ধারণা পেতে থাকবেন।

আজকালকার দিনে সোশ্যাল মিডিয়া, ফোন – ইত্যাদির কারণে নিজেকে সময় দেয়াটা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে।  নিজের জীবন ও লক্ষ্য সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা পাওয়ার জন্য এগুলো থেকে তো দূরে থাকবেনই।  এমনকি বই পড়ার উপকারিতা ভুলে যাবেন; মানে বইও পড়বেন না।  সময় কাটানোর মত কিছু যেন আপনার কাছে না থাকে – একমাত্র নিজের চিন্তাই যেন হয় আপনার সময় কাটানোর একমাত্র মাধ্যম।  চাইলে দূরে কোথাও বেড়াতে যেতে পারেন – তবে অবশ্যই একা একা যেতে হবে।  – এই ব্যাপারটা কিছুদিন চর্চা করলেই দেখবেন কত পরিস্কার ভাবে আপনি চিন্তা করতে পারছেন।  আগে হয়তো ভাবতেও পারেননি যে আপনি এত সুন্দর গুছিয়ে চিন্তা করতে পারেন!

১০. নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করুন, এবং তার জন্য জীবন উ‌ৎসর্গ করুন

ধনী বা সফল হতে হলে আপনার একটি মাত্র নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকতে হবে, এবং সেই লক্ষ্যের পেছনেই নিজের পুরোটা দিয়ে ছুটতে হবে।  পুরো আলোচনাটির মূল কথা আসলে এটাই।  আপনি যখন একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করতে পারবেন – তখন এই লক্ষ্যের পেছনে বাকি সব নীতি বা উপায় গুলো প্রয়োগ করতে পারবেন।

নিজের জীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ্য খুঁজে পাওয়ার জন্য আগের পয়েন্টে বলা পদ্ধতিটি খুবই কার্যকর।  এছাড়া জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ সঠিক ভাবে করার উপায়: “সাকসেস প্রিন্সিপালস” – (বুক রিভিউ) লেখাটিও আপনার উপকারে আসবে।

একবার লক্ষ্য ঠিক হয়ে গেলে, কোনও অবস্থাতেই লক্ষ্যকে বদলাবেন না।  যদি পরিস্থিতি বিচার করে মনে হয়, লক্ষ্যটি পূরণ করা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে লক্ষ্য না বদলে কৌশল বদলানোর চিন্তা করুন।  এই কথা কখনও মনে আনবেন না যে, আপনি লক্ষ্য পূরণ করতে পারবেন না।  এই মূহুর্তে হয়তো লক্ষ্য পূরণ করার ক্ষমতা আপনার নেই – কিন্তু একের পর এক উপায় চেষ্টা করে গেলে সঠিক উপায় একদিন অবশ্যই জানতে পারবেন।  নেপোলিয়ন হিল বলেন, “যখন সফলতা আসতে শুরু করবে, তখন এত দ্রুত আপনার উন্নতি হতে থাকবে যে, আপনার মনে হবে কেউ যেন জাদু করছে”

কিন্তু এটা আসলে কোনও জাদু নয়, লক্ষের পেছনে ছুটতে ছুটতে আপনি আসলে বড়লোক বা সফল হওয়ার গোপন উপায়টি নিজের অজান্তেই আবিষ্কার করে ফেলেছেন।!

পরিশিষ্ট

বড়লোক হওয়ার উপায় বা সফল হওয়ার উপায় আসলে গোপন কিছু নয়।  আপনার আমার সামনেই সেই উপায়গুলো আছে – কিন্তু সেগুলো এতই সাধারণ যে, আমাদের অনেক সময়ে বিশ্বাসই হয় না এগুলো ব্যবহার করেই মানুষ এত সফল হয়েছে।

প্রতিটি মানুষের সাফল্যের সূত্র হয়তো আলাদা, তাদের যাত্রা আলাদা – কিন্তু কোনও না কোনও ভাবে কিছু বিষয় সবার সাথেই ঘটে।  কিছু উপায় সবাই অবলম্বন করে।  হয়তো খালি চোখে সেগুলো ধরা যায় না – তাই আমাদের কাছে এগুলো আশ্চর্য মনে হয়।  নেপোলিয়ন হিল সেই আশ্চর্য সাধারণ উপায়গুলোই ২০ বছর ধরে দুই মলাটে বন্দী করেছেন, ৫০০ জনের বেশি সফল মানুষের ওপর গবেষণা করে।  বইয়ের ভূমিকায় লেখক বলেছেন, এ্যান্ড্রু কার্নেগী স্বয়ং তাঁকে এই বইটি লিখতে বলেছিলেন, যাতে মানুষ সফল ও ধনী হওয়ার একটি সহজ দিক নির্দেশনা পায়।  নেপোলিয়ন হিলের ছেলে কানে শুনতে পেতেন না।  বাবা যখন বইটি লিখছিলেন, তিনি অসমাপ্ত বইয়ের কিছু অংশ পড়ে সেগুলো নিজের জীবনে কাজে লাগান – এবং দারুন সফল ও ধনী হয়ে ওঠেন।

আপনিও চাইলে এই বইয়ের সাধারণ, কিন্তু কার্যকর উপায় গুলো নিজের জীবনে কাজে লাগিয়ে সফল হতে পারেন।  আর সেই পথে এই বুক রিভিউ যদি আপনাকে একটুও সাহায্য করে – তবে আমরা ধন্য।

লেখাটির ব্যাপারে যে কোনও মতামত আমাদের কমেন্ট করে জানান।  আপনার সব মতামতই আমাদের কাছে অমূল্য। 

যদি আপনার পছন্দের কোনও সেলফ ডেভেলপমেন্ট বইয়ের বুক রিভিউ আমাদের সাইটে দেখতে চান, তবে কমেন্ট করে জানান, আমরা দুই সপ্তাহের মধ্যে সেটি প্রকাশ করে আপনাকে মেনশন করার চেষ্টা করব। 

যদি মনে করেন এই লেখা পড়ে অন্যরাও উপকৃত হবেন, এবং মূল বইটির বিষয়বস্তু বুঝতে সহায়ক হবে – তবে শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন। 

এই ধরনের আরও লেখার জন্য নিয়মিত আমাদের সাথে থাকুন।  সাফল্যের পথে লড়াকু সব সময়ে আপনার সাথে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *