৩টি কৌশলের মাধ্যমে ব্যবসায়িক ব্যর্থতা দ্রুত কাটিয়ে উঠুন – বুক রিভিউ


  • By
  • April 21st, 2019
  •    
  • পড়তে সময় লাগবে: 3 minutes
  • 3,253 views
3 mins read

উদ্যোক্তা হয়েছেন, কিন্তু ব্যর্থতার স্বাদ পাননি – এমন মানুষ মনেহয় একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সফল উদ্যোক্তা হওয়ার একটি প্রধান শর্তই হল, আপনাকে বেশ কয়েকবার ব্যর্থ হয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে হবে। হয়তো সব হারিয়ে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। ‍ব্যর্থ হওয়ার পরও যারা হাল না ছেড়ে কাজ করতে থাকেন, এবং দ্রুত ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন – তাঁরাই আসলে শেষ পর্যন্ত সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন।

আলোচিত বিজনেস বুক “ফুয়েলড্ বাই ফেইলর” (Fueled by Failure) – এর লেখক ও মার্কেটিং সফটঅয়্যার কোম্পানী “ইনটিগ্রেট” এর ফাউন্ডার-সিইও, এবং সাবেক অলিম্পিক বিজয়ী স্কিয়ার জেরেমি ব্লুম তাঁর বইয়ে দেখিয়েছেন, কিভাবে একজন উদ্যোক্তা তাঁর প্রাথমিক ব্যর্থতার মানসিক ধাক্কা তাড়াতাড়ি কাটিয়ে উঠবেন, এবং কিভাবে ব্যর্থতা থেকে সঠিক শিক্ষাটি নিয়ে পরের বার বিজয়ী হবেন।

Fueled by Failure – এর এই বুক রিভিউতে আমরা আজ ৩টি মানসিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করব, যেগুলো ব্যবহার করে লেখক ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়ানো এবং জেতার চেষ্টা করার শক্তি ফিরে পেয়েছিলেন।

লেখকের মতে, ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠে আবার সাফল্যের দিকে যাত্রা করার জন্য মূলত ৩টি মানসিক বিষয় চর্চা করা দরকার।

চলুন, একে একে আমরা এই ৩টি বিষয় জেনে নিই:

০১. বিশেষ মেডিটেশন

লেখক বলেন – “মনকে নদীর মত করার ব্যাপারটা প্রথম আমার মাথায় আসে যখন আমি নিজের ব্যাপারে নিচু ধারণাগুলো কোনওভাবেই দূর করতে পারছিলাম না, এবং সে কারণে আমি বার বার ব্যর্থ হচ্ছিলাম। স্কি ওয়ার্লড কাপ এ একবার এক প্রতিযোগীর সাথে আমার গোলমাল বাধল। আমি নিজে জেতার চেয়ে বেশি তাকে হারাতে চাইছিলাম। অন্য কোনও দিকে মনোযোগ না দিয়ে শুধু তার দিকে মনোযোগ দিয়েই খেলতে শুরু করলাম। এবং সেই কারণে আমি প্রতিযোগীতা জিততে পারলাম না। এর পর থেকে এমন হল, যে কোনও ম্যাচেই আমার শুধু মনে হত, ’আমি পারবো না’, ‘আমি প্রস্তুত না’, ‘আমার পায়ে সমস্যা হচ্ছে’, ‘আমি অনেক বেশি পিছিয়ে পড়েছি – এখান থেকে ফিরে আসা সম্ভব না’ – ইত্যাদি নেতিবাচক চিন্তা।”

এগুলো আসলে আত্মঘাতী বা “Self-Defeating thoughts” – এই ধরনের চিন্তা মানুষকে তার নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করতে দেয় না। কারণ, এইসব চিন্তার কারণে সে হারার আগেই হেরে বসে থাকে। অতীত ব্যর্থতা এইসব চিন্তা মাথায় আসার অন্যতম একটি কারণ। – বিজনেস প্রেজেন্টেশন, ইন্টারভিউ – বা এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই চিন্তাগুলো বেশি মাথায় আসে।

লেখক বলেন, এই ধরনের চিন্তা আসাটা আসলে স্বাভাবিক। আমাদের শুধু এগুলোর সাথে লড়াই করার প্রস্তুতি থাকতে হবে।

’মনকে নদীর মত’ করে ফেলাটা আসলে সেই লড়াই করার প্রস্তুতি। লেখক বলেন, “এটি খুব সাধারণ,কিন্তু খুবই শক্তিশালী একটি কৌশল”।

এটি আসলে একটি মেডিটেশন। ‍মস্তিষ্ককে শান্ত করার জন্য, এবং কোনওকিছু বিশ্বাস করানোর জন্য মেডিটেশন একটি দারুন পদ্ধতি।

লেখক বলেন, এই পদ্ধতিতে মেডিটেশন করার জন্য আপনাকে নিরিবিলি নির্জন কোনও জায়গায় চোখ বন্ধ করে বসতে হবে। তারপর কল্পনা করতে হবে একটি স্রোতবহুল নদী, আর নদীর মাঝে একটি পাথর যেটা আসলে আপনার মন। নদীর স্রোত এমন যে, সেই পাথরের ওপর কোনও আবর্জনা থাকতে পারে না।

আপনার আত্মঘাতী চিন্তাগুলোকে পাথরের ওপর জমে থাকা শ্যাওলা বা আবর্জনা হিসেবে চিন্তা করুন। এক একটি চিন্তাকে এক একটি রঙ অথবা আকার দিতে পারেন। তারপর চিন্তা করুন নদীর দ্রুত বহমান স্রোত সশব্দে এই আবর্জনা/শ্যাওলারূপী চিন্তাগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

লেখক পরামর্শ দেন যে, প্রথমে এটি কোনও ফল নাও দিতে পারে। কিন্তু প্রাকটিস বন্ধ করা যাবে না। এভাবে মেডিটেশন করার পাশাপাশি, নিজেকে নিয়ে কোনও ধরনের আত্মবিশ্বাস নষ্টকারী চিন্তা মাথায় আসলেই নদীর দৃশ্য ও শব্দ কল্পনা করতে হবে। এটা টানা কিছুদিন করতে পারলে, মস্তিষ্ক বিশ্বাস করতে শুরু করবে যে, নদীর স্রোত আসলেই নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

মস্তিষ্কের একটি মজার দিক হল, সে কল্পনা ও বাস্তবে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। কোনও সুন্দর দৃশ্য চোখের সামনে দেখলে সে যেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে, কল্পনা করলেও আপনার প্রায় একই ধরনের অনুভূতি হবে।

মন থেকে নেগেটিভ অনুভূতি দূর করে সেখানে পজিটিভ চিন্তা বা ইতিবাচক অনুভূতি বসাতে পারলে আপনি আবার নিজের কাজ শুরু করতে পারবেন। অতীত ব্যর্থতা আপনাকে আর পেছনে টেনে রাখতে পারবে না।

০২. নিজের সাথে একান্ত সময় কাটান

লেখকের মতে, ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার জন্য দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে নিজের সাথে একান্তে কিছু সময় কাটানো উচিৎ।

ছোট-বড়, যে কোনও ব্যর্থতাই শুধু একজন মানুষকেই প্রভাবিত করে না। একজন উদ্যোক্তা যে কোনও পর্যায়ে ব্যর্থ হলে, তার আশপাশের মানুষ, কর্মী, পার্টনার, প্রতিযোগী – সবাই কোনও না কোনও ভাবে প্রভাবিত হয়। উদ্যোক্তা হওয়ার সবচেয়ে ভালো দিক যেমন নিজের মত করে সবকিছু চালাতে পারা, এর সবচেয়ে কঠিন দিক হল কোনও খারাপ কিছু ঘটলে তার পুরো দায় নিজেকে নিতে হয়।

আপনাকে হয়তো অনেক সমালোচনা শুনতে হবে। যারা আপনাকে থামাতে চেয়েছিল, তারা আপনাকে নিয়ে টিটকারি দেবে। কেউ কেউ হয়তো বলবে যে, আপনার ওপর ভরসা করে তার সর্বনাশ হয়ে গেল। – এসব কথায় বেশি কান দিলে আপনার আত্মবিশ্বাস দারুন ভাবে ভেঙে যাবে।

এই ধরনের কথায় বা আচরণে উত্তেজিত বা হতাশ হবেন না। কিছুদিনের জন্য যতটা পারুন নিজের সাথে একান্তে সময় কাটান। সবচেয়ে ভালো হয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে  ভরা কোথাও চলে গেলে। প্রকৃতি মানুষের মনে অন্যরকম একটা প্রশান্তি নিয়ে আসে। প্রথম দিকে মানসিক চাপ থাকলেও, একটা সময়ে গিয়ে প্রকৃতির সংস্পর্শে চাপগুলো দূর হয়ে যায়। এই সময়টায় নিজের উদ্দেশ্যে ভালো ভালো কথা বলুন। নিজেকে বলুন যে, একটি কাজে ব্যর্থ হয়েছেন মানেই সব শেষ নয়। আপনি আবার শুরু করতে পারবেন। তবে নিজের ভুল গুলোকে এড়িয়ে যাবেন না। তাহলে আরও বেশি বিপদে পড়বেন।

একান্ত ভাবে সময় কাটানোর সময়ে বাস্তববাদী মনোভাব নিয়ে নিজের অতীতের ভুল গুলো নিয়ে চিন্তা করুন। কোথায় কোথায় কি কি ভুল হয়েছে তা চিন্তা করুন, এবং ভবিষ্যতে কিভাবে সেগুলো এড়াবেন সেই পরিকল্পনা করুন। ভুল নিয়ে আফসোস না করে, বা অন্যের কথায় হতাশ না হয়ে – সেগুলো একটি একটি করে চিহ্নিত করে, সেগুলো এড়ানোর প্ল্যান করুন। প্রয়োজনে লিখিত পরিকল্পনা করুন। সম্ভাব্য সব ভুল, এবং সেগুলোর ভবিষ্যৎ সমাধান বের হয়ে গেলে দেখবেন অনেক হাল্কা লাগছে। আবার নতুন করে শুরু করার উদ্যম পাচ্ছেন।

০৩. নিজের দক্ষতার দিকে মন দিন

লেখক বলেন, যে কোনও ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার জন্য নিজের দক্ষতা ও জ্ঞানকে আরও উন্নত করার বিকল্প নেই। এটা আপনাকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস যোগাবে। এবং আপনি নতুন করে শুরু করার অনুপ্রেরণা পাবেন।

তিনি তাঁর নিজের স্কি কোচ কুপার চেল এর উদাহরণ টেনে বলেন, “চেল আমাকে শিখিয়েছেন যে, আমি যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, নিজের দক্ষতার ওপর কাজ করলে সেই অবস্থা থেকে ফিরে আসা সম্ভব। আমি যদি অন্যদের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করি, এবং বেশি সময় ধরে অনুশীলন করি, তবে আমি জিতবই। এই একটি আইডিয়া আমাকে যে কোনও অবস্থাতে আত্মবিশ্বাসী থাকতে সাহায্য করে।”

লেখক আরও বলেন, “আমরা সবাই জীবনে কখনও না কখনও খারাপ সময়ের মাঝে পড়ে যাই। আপনি যখনই এমন অবস্থায় পড়বেন – তখনই নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর কাজে লেগে যাবেন। এতে আপনি নেতিবাচক চিন্তা করে সময় কাটানোর বদলে, নতুন কিছু শিখে সময় পার করবেন – যা আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। আপনি যদি বিক্রয় বিশেষজ্ঞ হন, তবে সেলস এবং মার্কেটিং নিয়ে আরও পড়াশুনা করুন, কোর্স করুন, সিনিয়রদের পরামর্শ নিন – যাতে পরবর্তীতে একটি সফল ক্যাম্পেইন চালাতে পারেন। যদি ফাইন্যান্স এ দক্ষ হন, তবে এই বিষয়ে আরও বেশিকিছু শেখার চেষ্টা করুন – যাতে পরের বার আরও পারফেক্ট বাজেট করতে পারেন। যেটাই আপনার আগ্রহ আর দক্ষতার জায়গা হোক না কেন – সবখানেই আপনি নতুন কিছু শেখার পাবেন। যেটা আপনাকে ব্যর্থতার কারণ বের করার পাশাপাশি নতুন করে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রেরণা যোগাবে”

পরিশিষ্ট:

মানুষ যত বড় ব্যর্থতা আর হতাশার মাঝেই পড়ুক না কেন, সেখান থেকে বের হয়ে আসার এবং আবারও শুরু করার শক্তি তার ভেতরেই আছে।

নিজের ভেতরের নেতিবাচক চিন্তাগুলোই আসলে আমাদের পেছনে টেনে রাখে। এই চিন্তাগুলোই আমাদের নতুন করে শুরু করতে দেয় না।

Fueled by Failure বইয়ের ৩টি লিসন কাজে লাগিয়ে অনেকেই এক্ষেত্রে উপকৃত হয়েছেন, যার মধ্যে লেখক নিজেও আছেন। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষাগুলো আপনাকেও যে কোনও সময়ে ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

লেখাটির বিষয়ে আপনার যে কোনও মতামত আমাদের কমেন্ট করে জানান। আপনার প্রতিটি মতামতই আমাদের কাছে মহামূল্যবান। 

আর যদি মনে হয় লেখাটি অন্যদেরও উপকার করবে – তবে শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন। 

আমরা আমাদের পাঠকদের কাছ থেকেও অনুপ্রেরণামূলক লেখা আশা করছি।  এই ধরনের লেখা যদি আপনিও লিখতে পারেন তবে write@test.edaning.com – এ ইমেইল করতে পারেন।  আপনার লেখা যত্ন সহকারে আপনার নাম সহ আমরা প্রকাশ করব। 

নিয়মিত অনুপ্রেরণামূলক ও আত্ম উন্নয়ন মূলক লেখা পাওয়ার জন্য আমাদের সাথে থাকুন।  সাফল্যের পথে লড়াকু সব সময়ে আপনার সাথে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *